ছায়ার মতো বেঁচে থাকা: ফাতেমা বেগমের এক নিঃশব্দ মহাকাব্য।
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০১-০১-২০২৬ ০১:৫৪:১৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-০১-২০২৬ ০১:৫৪:১৪ অপরাহ্ন
ফাতেমা বেগমের
মাহফুজুর রহমান.
ইতিহাসের পাতায় সবসময় রাজাদের বিজয়গাঁথা লেখা হয়, স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা হয় বীরদের নাম। কিন্তু সেই রাজপ্রাসাদের গভীরে যে প্রদীপটি নিজেকে তিল তিল করে পুড়িয়ে চারপাশ আলোকিত করে রাখে, তার নাম কেউ মনে রাখে না।
বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রে খালেদা জিয়া যখন এক ‘আপসহীন নাবিক’, তখন ঝোড়ো হাওয়ায় সেই পালের দড়িটি শক্ত করে ধরে রাখা এক নিভৃতচারী নারীর নাম—ফাতেমা বেগম।
ভোলার উপকূলীয় নোনা বাতাস আর অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা এক অতি সাধারণ তরুণী ছিলেন ফাতেমা। .
অকাল বৈধব্য আর দুই সন্তানের ক্ষুধার জ্বালা যখন তাকে দিশেহারা করে তুলল, তখন আশ্রয়ের খোঁজে তিনি পা রেখেছিলেন কংক্রিটের শহর ঢাকায়। নিয়তি তাকে পৌঁছে দিয়েছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার অন্দরমহলে। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া সেই সফর আর কোনোদিন থামেনি। ফাতেমা তখন জানতেন না, তিনি কেবল একজন ব্যক্তিগত পরিচারিকা নন, বরং ইতিহাসের এক অন্ধকারতম অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী হতে যাচ্ছেন।
২০১৪ সালের সেই দিনগুলোর কথা ভাবুন। চারদিকে বালুর ট্রাকের পাহাড়, পুলিশের ব্যারিকেড আর এক রুদ্ধশ্বাস অস্থিরতা। ক্যামেরার লেন্স যখন নেত্রীর ক্ষুব্ধ মুখচ্ছবি খুঁজছে, ঠিক তখনই ফ্রেমের এক কোণে দেখা যেত এক জোড়া সতর্ক চোখ। তিনি ফাতেমা। পুলিশ আর জনতার রণক্ষেত্রে ফাতেমা নিজের শরীরটাকে বানিয়েছিলেন ম্যাডামের ঢাল। কোনো বেতন বা চাকরির চুক্তিতে এমন আনুগত্য কেনা যায় না; এ ছিল হৃদয়ের এক অদৃশ্য টান।
মানুষ সাধারণত লড়াই করে স্বাধীনতার জন্য, কিন্তু ফাতেমা লড়াই করেছিলেন পরাধীনতাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। যখন খালেদা জিয়ার জন্য নির্জন কারাগারের দরজা খুলে গেল, ফাতেমা চাইলে পারতেন সন্তানদের কাছে ফিরে গিয়ে শান্তির জীবন বেছে নিতে। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন জেলের নির্জন প্রকোষ্ঠ। মুক্ত আকাশ বিসর্জন দিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় কারাবরণ করলেন, যেন তার ম্যাডামকে এক মুহূর্তের জন্যও একাকীত্ব গ্রাস করতে না পারে।
মহামারীর দিনগুলো: যখন আপনজনরা ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে দূরত্ব বজায় রাখে, ফাতেমা তখন করোনায় আক্রান্ত নেত্রীকে পরম মমতায় সেবা করেছেন।
নির্বাসনের সঙ্গী: লন্ডনের সফর থেকে শুরু করে হাসপাতালের দীর্ঘ রাত—ফাতেমা ছিলেন সেই ছায়া, যা দেহকে কখনো ছেড়ে যায় না।
আজকের রাজনীতিতে যখন আনুগত্য কেনাবেচা হয়, পদ-পদবির লোভে আদর্শ বদলানো নিয়মিত ঘটনা, তখন ফাতেমা এক বিষ্ময়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ফাতেমা হয়তো শত কোটি টাকার মালিক হবেন না, পাবেন না কোনো বড় খেতাব। তিনি ইতিহাসের সেই ট্র্যাজিক চরিত্র, যারা নেপথ্যে থেকে সবকিছু বিলিয়ে দেন কিন্তু বিনিময়ে কিছুই আশা করেন না।
আজকের এই শোকের দিনে দেশ হারিয়েছে একজন নেত্রীকে, তারেক রহমান হারিয়েছেন মাকে। কিন্তু ফাতেমা বেগম যা হারিয়েছেন, তা কোনো শব্দ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তিনি হারিয়েছেন তার জীবনের একমাত্র 'ধ্রুবতারা'কে, যাকে ঘিরে গত ১৬টি বছর আবর্তিত হয়েছে তার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস।
কোনোদিন যদি ইতিহাসের পাতায় এই সময়ের বায়োপিক তৈরি হয়, সেখানে হয়তো বড় বড় রাজনৈতিক নামগুলোই প্রাধান্য পাবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ফাতেমা বেগম বেঁচে থাকবেন এক 'আনসাং হিরো' হয়ে। কারণ ফাতেমারা স্বজন হারানোর বেদনা বিক্রি করতে জানেন না, তারা কেবল জানেন নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে আর শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আগলে রাখতে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স