ঢাকা , বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬ , ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আজিমপুরে ‘স্বপ্নের ফ্ল্যাট’ নাকি শত কোটি টাকার গোপন লুটের আসর? ৭৭৪ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প!

লিটন আলী
আপলোড সময় : ০১-০৪-২০২৬ ০২:৪৫:২৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০১-০৪-২০২৬ ০২:৪৫:২৫ অপরাহ্ন
আজিমপুরে ‘স্বপ্নের ফ্ল্যাট’ নাকি শত কোটি টাকার গোপন লুটের আসর?   ৭৭৪ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প! অভিযোগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম


রাজধানীর আজিমপুর—যেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বপ্নের আবাসন গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেখানে এখন ভেসে উঠছে এক ভিন্ন গল্প। ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার এই মেগা প্রকল্প যেন পরিণত হয়েছে অদৃশ্য এক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রিত ‘লুটের সাম্রাজ্যে’, যেখানে নিয়ম, নীতি আর জবাবদিহিতা হারিয়ে গেছে অন্ধকারের গভীরে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন ১১টি বহুতল ভবন ও ৮৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণকে কেন্দ্র করে উঠেছে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ। সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়া চিত্র—প্রকল্পের প্রতিটি স্তরে চলছে জালিয়াতি,ঘুষ বাণিজ্য আর ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদ। বলা হচ্ছে, দূরে থেকেও ইলিয়াস আহমেদ যেন অদৃশ্য সুতোয় টানছেন পুরো প্রকল্পের লাগাম, আর ফয়সাল হালিমের সঙ্গে মিলেই সাজাচ্ছেন টেন্ডারের গোপন খেলা।

পিপিআর-২০১৫ যেন এখানে কেবল কাগজের নিয়ম—বাস্তবে চলছে পছন্দের ঠিকাদার বাছাইয়ের নাটক। যোগ্য প্রতিযোগীদের কারিগরি অজুহাতে বাদ দিয়ে ‘নিজেদের লোকদের’ কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। অভিযোগ অনুযায়ী, শুরুতেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে অগ্রিম ঘুষ নেওয়া হয়েছে—যেন এই প্রকল্পে প্রবেশের টিকিটই হলো দুর্নীতির চুক্তিপত্র!

নথিতে যেখানে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ, বাস্তবে সেখানে কাজের অগ্রগতি থেমে আছে ৭০-৮০ শতাংশে। এই ফাঁকেই লুকিয়ে আছে শত শত কোটি টাকার রহস্যময় গায়েব হয়ে যাওয়া—যেন ইট-পাথরের আড়ালে গিলে ফেলা হয়েছে রাষ্ট্রের অর্থ।

অভিযোগ থেমে নেই এখানেই। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের নামে বাধ্যবাধকতা তৈরি, আর অযৌক্তিকভাবে প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে তিন গুণ বাড়ানোর মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। এতে করে পুরো প্রকল্পটি যেন পরিণত হয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ‘নীল নকশার লুটপাটে’ যেখানে সাধারণ ঠিকাদারদের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কালো অধ্যায়। কোনো পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়েছে আজিমপুরের পুরনো দেশি গাছ। শিশুদের খেলার মাঠও রেহাই পায়নি—সেখানে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা স্থানীয়দের ক্ষোভকে আগুনের মতো জ্বালিয়ে তুলেছে।

অভিযোগকারী, যিনি নিজেও গণপূর্তের একজন ঠিকাদার, দাবি করেছেন—প্রকল্পের নথিপত্র ও ব্যয়ের হিসাব সঠিকভাবে যাচাই করলেই বেরিয়ে আসবে এই মহাদুর্নীতির পুরো চিত্র। তিনি অবিলম্বে সব টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত করে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম বলেন, আমি এখানে পরে যোগদান করেছি, তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না।
অন্যদিকে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান জানিয়েছেন, কোথাও অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে, এবং প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবুও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই প্রকল্প কি সত্যিই আবাসনের স্বপ্ন পূরণ করবে, নাকি এটি হয়ে উঠবে দুর্নীতির আরেকটি দৃষ্টান্ত?

উল্লেখ্য যে, এখন দৃষ্টি সবার—দুদকের দিকে।
কারণ, এই গল্পের শেষটা কি হবে বিচার, নাকি আবারও নীরবতায় চাপা পড়বে শত কোটি টাকার সত্য?

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ