৫১৭ কোটি টাকার ভর্তুকি লোপাটে জড়িতদের বাঁচানোর চেষ্টা
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০২-০৪-২০২৬ ০৮:৫০:৪২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০২-০৪-২০২৬ ০৮:৫০:৪২ অপরাহ্ন
সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে যন্ত্র সরবরাহ করে সরকারের কয়েকশ কোটি টাকার ভর্তুকি লোপাট করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কম্বাইন হারভেস্টর সরবরাহকারী ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান ৫১৭ কোটি টাকার ভর্তুকি লোপাটে জড়িয়েছে বলে প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাতে শাস্তির মুখে পড়তে না হয়, একটি মহল সে বন্দোবস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃষি এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনিয়মকারীদের বাঁচাতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এই প্রকল্প বন্ধের চূড়ান্ত আয়োজন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় সম্প্রতি প্রকল্পটি বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ মন্ত্রণালয় চাইলেই লোপাট হওয়া অর্থের একটা বড় অংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্পে পাঁচশ কোটি টাকা থাকার পরও কৃষি মন্ত্রণালয়ের চক্রটি দীর্ঘদিন থেকে প্রকল্পটি বন্ধের চেষ্টা করে আসছে। গত ১২ মার্চ পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের আয়োজনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়। প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনের প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান ওই সভায় বলেন, ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা জুন-২০২২ অনুযায়ী, প্রকল্প শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগে মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবনা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ প্রকল্পটির মেয়াদপূর্তির ৭ মাস পরে সংশোধন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা অনভিপ্রেত।
এ সময় উপস্থিত কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব জানান, সংশোধন প্রস্তাব দিতে দেরি হওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের দায় আছে এবং এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেরি হওয়ার কারণ মূলত ‘ইচ্ছাকৃত’। কমিশনের সভায়ও বলা হয়েছে, খারাপ উদ্দেশ্য থাকার কারণেই প্রকল্পটি এভাবে জোর করে বন্ধ রাখার চেষ্টা হয়েছে। সাবেক সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দিয়ে এই প্রস্তাবনা আটকে রাখেন। তার নির্দেশনায় প্রকল্প অফিসের কর্মকর্তাদের দিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বরং প্রতিবেদন দিয়ে সুবিধাভোগী হয়েছেন। ফলে এমন এক সময়ে কমিশনে মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করার অনুমতি দেয়, যখন এই প্রস্তাব দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় ফুরিয়ে গেছে। অথচ মেয়াদ বৃদ্ধি করে প্রথম সংশোধনীর কাজটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার, যার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে যাওয়ার দরকারই পড়ে না। অথচ টাকা থাকার পরও এই জটিলতায় টাকা ছাড় না হওয়ায় প্রকল্পের প্রায় ১০০ কর্মকর্তা ৭ মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতন-ভাতা বঞ্চিত, যাদের এই অনিয়মে সংশ্লিষ্টতা নেই।
অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালেও তার অনুগত কিছু কর্মকর্তা রয়ে গেছেন। যারা প্রকল্পটি যাতে আবার চালু না হয়, সে বিষয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে একজন কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনু বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মির্জা আশফাকুর রহমান।
অভিযোগ রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ওয়াহিদা আক্তার, এমদাদ উল্লাহ মিয়ানসহ প্রকল্পের অনিয়মকারী যারা আছেন তাদের যাতে কোনো শাস্তির মুখে পড়তে না হয়, সেজন্য কিছু কর্মকর্তা জোরেশোরে চেষ্টা চালাচ্ছেন। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে পিইসি সভার কার্যবিবরণীতে।
পিইসি সভায় সিদ্ধান্তে কৃষি মন্ত্রণালয়কে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জানা গেছে, বিধি অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয় চাইলে এখনো প্রকল্পটি আবার চালু করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘প্রকল্পে লুটপাট হয়েছে বলেই তা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আমরা প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি যাতে কোথায় কীভাবে, কারা সরকারের ভর্তুকি আত্মœসাতে জড়িত তাদের খুঁজে বের করতে। তারপর সে অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
গত ৩০ মার্চ কৃষি মন্ত্রণালয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনা সভায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘যে সব প্রকল্প প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে সেগুলোর কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। দুর্নীতি হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি পুনরায় চালু করলে দুটি কাজ একসঙ্গে হবে। প্রকল্পের অব্যয়িত ৫২৮ কোটি টাকায় স্বচ্ছভাবে যন্ত্র বিতরণের সুযোগ যেমন মিলবে তেমনি মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকা ক্ষমতা (দুদকের ওপর নির্ভর না করেই) ব্যবহার করে অনিয়মকারীদের কাছ থেকে ভুয়া বিলের মাধ্যমে তুলে নেওয়া ভর্তুকির টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি যেসব কর্মকর্তা এসব অনিয়মে সুযোগ দিয়েছেন তাদেরও আনা যাবে বিচারের আওতায়।
তদন্তে যা পাওয়া গেছে : কৃষির আধুনিকায়নের নামে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২০ সালে প্রকল্পটি শুরু হয়। ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে। যখন কৃষিমন্ত্রী ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক এবং সচিব ছিলেন ওয়াহিদা আক্তার। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কেউ ব্যবস্থা নেননি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বছরের পর বছর ধরেই প্রকল্পের দুর্নীতির ফিরিস্তি খুঁজতে শুধু তথ্যই সংগ্রহ করেছে। প্রায় চার বছরে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেনি।
অথচ প্রকল্প থেকেই করা এক অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৩টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ৮৫০টি কম্বাইন হারভেস্টর যন্ত্রের বিপরীতে একাধিকবার বিল উত্তোলন করেছে। একই সময়ে আরও ৯৭১টি যন্ত্রের ভর্তুকির বিল নেওয়া হয়েছে, যে যন্ত্রগুলোর মাঠে কোনো অস্তিত্বই নেই। যেখানে ভর্তুকির নামে সরকারের ৫১৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তদন্তের অপর একটি অংশে কোম্পানিগুলোর আমদানি ও বিক্রি করা যন্ত্রের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ভর্তুকির অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটিয়েছে বাংলামার্ক করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি একাই ৭৩২টি যন্ত্রের বিপরীতে ভুয়া বিল তুলে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যতগুলো যন্ত্র আমদানি করেছে তার চেয়েও ৭৩২টি যন্ত্রের বেশি বিল নিয়েছে। এর পরের তালিকায় রয়েছে এসকিউ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। একইভাবে প্রতিষ্ঠানটি আমদানির চেয়ে ৫৮৩টি যন্ত্র বেশি বিক্রি দেখিয়েছে।
এ ছাড়া চিটাগাং বিল্ডার্স অ্যান্ড মেশিনারি ২৭৮টি, আদি এন্টারপ্রাইজ ২৬৮টি, মেটাল অ্যাগ্রিটেক ১৯৭টি, এসিআই মোটরস ১৬৯টি, উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং ১৮৮টি, আবেদিন ইক্যুইপমেন্টে ৬৯টি, আলীম ইন্ডাস্ট্রিজ ৬৩টি, গ্রিনল্যান্ড টেকনোলজিস ২টি, মেকডোনাল ক্রপকেয়ার ৩টি, ইয়ন মোটরস ২২টি এবং আনসার এনার্জি বাংলাদেশ ১১টি মেশিনের বিপরীতে বিল তুলেছে, যেগুলো আসলে আমদানিই হয়নি।
বকেয়া বিলের জন্য পাঁয়তারা : প্রকল্প অফিস সূত্রে জানা গেছে, কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৯ কোম্পানি প্রকল্পের কাছে ১০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বিল পাবে। এর মধ্যে ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বেশি পাওনা রয়েছে বাংলামার্কের। অথচ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা এই বিল তোলার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবকে ম্যানেজ করার জন্য তদবির চালাচ্ছেন বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স