পদে ঘোড়ার আগে গাড়ি ঢাকা ওয়াসার ডিএমডি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১২-০৪-২০২৬ ০৬:৩৮:৪৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১২-০৪-২০২৬ ০৬:৩৮:৪৪ অপরাহ্ন
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি
নজিরবিহীন জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনায় ঢাকা ওয়াসায় চলছে তীব্র বিতর্ক ও অস্থিরতা। নিয়ম ভঙ্গ এবং জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে চলতি দায়িত্বের দুই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১৯ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে চার ধাপ ওপরের পদে এই দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
বিষয়টিকে প্রশাসনিক বিধি ও প্রচলিত রীতির পরিপন্থি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি ওই দুই কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকলেও তাদের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী, যা ডিএমডি পদের চার ধাপ নিচে। একই সঙ্গে একাধিক স্তরে একই কর্মকর্তার স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে ঢাকা ওয়াসায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পদ শূন্য হওয়ায় ঢাকা ওয়াসার দুজন প্রকৌশলীকে ডিএমডি (আর পি অ্যান্ড ডি) এবং ডিএমডি (ও অ্যান্ড এম) পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিএমডি পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া মো. আজিজুল হক বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে এবং বর্ধিত ঢাকা পানি সরবরাহ রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আর মির্জা গোলাম কিবরিয়া ওয়াটার অ্যান্ড স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে রয়েছেন।
গত ৭ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ অনুবিভাগ থেকে জারি করা অফিস আদেশে ওই দুজনকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তাদের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী। বর্তমানে ওই দুজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে রয়েছেন।
প্রচলিত প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ তার পরবর্তী উচ্চতর পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে সেই বিধি লঙ্ঘন করে চার ধাপ ওপরের পদে দায়িত্ব দেওয়ায় বিষয়টি নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ঢাকা ওয়াসায় প্রধান প্রকৌশলী পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই ডিএমডি পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার নজির ছিল। এমন নজিরবিহীন পদায়নকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে ঢাকা ওয়াসায়।
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই দুই কর্মকর্তা মূলত নির্বাহী প্রকৌশলী, যদিও বর্তমানে তারা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে রয়েছেন। কিন্তু ডিএমডি পদটি তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে চার ধাপ ওপরের। প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তাকে সাধারণত তার পরবর্তী উচ্চতর পদেই অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় এই পদায়নকে ‘ব্যতিক্রম নয়, বরং স্পষ্ট অনিয়ম’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়াসার গ্রেড অনুযায়ী—নির্বাহী প্রকৌশলী পঞ্চম গ্রেড, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী চতুর্থ গ্রেড, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তৃতীয় গ্রেড এবং প্রধান প্রকৌশলী দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা। ডিএমডি চুক্তিভিত্তিক পদ হওয়ায় গ্রেড নির্ধারণ করা নেই। যেহেতু এটি প্রধান প্রকৌশলীর ওপরের পদ, কাজেই তা দ্বিতীয় গ্রেড বা তদূর্ধ্ব গ্রেডের হবে। অর্থাৎ পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাকে দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মকর্তার ওপরের পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন নিয়ে। ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলীদের তালিকা অনুযায়ী, মো. আজিজুল হকের সিরিয়াল ২০ এবং মির্জা গোলাম কিবরিয়ার সিলিয়াল নম্বর ২১। অর্থাৎ তাদের ওপরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীসহ অন্তত ১৯ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন; যাদের ডিঙিয়ে তাদের এই উচ্চপদে বসানো হয়েছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে জুনিয়রদের ওপরের পদে দায়িত্ব দেওয়ায় সংস্থার অভ্যন্তরে ক্ষোভ, হতাশা এবং অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
শুধু জ্যেষ্ঠতা বা উচ্চপদে দায়িত্ব অর্পণ নয়, ঢাকা ওয়াসায় ডিএমডি পদে জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রীতিনীতিও লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওয়াসা আইন ১৯৯৬ অনুযায়ী, ডিএমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে ওয়াসা বোর্ডের সুপারিশ এবং সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ক্ষেত্রে বোর্ডের সুপারিশ ছাড়াই স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ শাখা থেকে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হয়েছে। চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ অর্থ সাময়িকভাবে কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার মূল পদের বা গ্রেডের সমপদে বা সমগ্রেডের কিংবা ক্ষেত্রমত নিম্নপদে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত অন্য কোনো শূন্যপদে দায়িত্ব দেওয়া যাবে। অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের ভিত্তি হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো পদ সাময়িকভাবে শূন্য হলে সমপদে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা যাবে।
এদিকে, প্রশাসনিক জটিলতাও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি ডিএমডি হিসেবে স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রে একই নথি একাধিক ধাপে ঘুরে আবার তাদের কাছেই আসতে পারে, যা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ তৈরি করে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া অনিয়মিত নিয়োগের পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচলিত নীতি অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কোনো নথি তৈরি বা স্বাক্ষর করার পর তা নিয়ম অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের—যেমন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীর মাধ্যমে অনুমোদিত হয়ে ডিএমডির কাছে যায়। এ ক্ষেত্রে ওই দুই নির্বাহী প্রকৌশলীর নথি অনুমোদনের জন্য আবার ডিএমডি হিসেবে একই কর্মকর্তার কাছেই ফিরে আসবে। অর্থাৎ একই ব্যক্তি একাধিক স্তরে একই নথি অনুমোদন করবেন, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলীসহ একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু নিয়মবহির্ভূতই নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এতে সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তাদের দাবি, নিয়ম ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে নেওয়া এমন সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে ঢাকা ওয়াসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এরই মধ্যে এ ধরনের অফিস আদেশের ফলে ঢাকা ওয়াসায় কাজের পরিবেশও নষ্ট হয়ে গেছে। সিনিয়র প্রকৌশলীদের পক্ষে ঢাকা ওয়াসায় কাজ করাও দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত এই পদায়ন আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
ডিএমডি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা আজিজুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে এই আদেশ হয়েছে। এখানে আমার কিছু করার নেই। এ ছাড়া আমি নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও দীর্ঘ বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকার কারণে বর্তমানে চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা।’
প্রকৌশলীদের সিরিয়ালে তিনি ১৪ নম্বরে থাকার দাবি করেন আজিজুল হক। যদিও তালিকা বলছে, তিনি ২০ নম্বর সিরিয়ালে আর মির্জা গোলাম কিবরিয়ার সিরিয়াল ২১ নম্বর। এ ছাড়া অনেক বছরে ধরে তিনি পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন বলেও দাবি করেন এই প্রকৌশলী।
আর মির্জা গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো অভিমত নেই। বিস্তারিত জানতে চাইলে অফিসে আসেন, তারপর কথা হবে।’
জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘এটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় থেকে অফিস আদেশের মাধ্যমে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’ তার দাবি, ঢাকা ওয়াসার মূল কাজ সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করা, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার তার নেই।
এমডি আরও বলেন, ‘এটি কোনো স্থায়ী নিয়োগ নয়; এটি কেবল একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব। তারা শুধু তাদের ওপর অর্পিত নির্দিষ্ট দায়িত্বগুলো পালন করবেন।’ এ ছাড়া এই ধরনের সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগতভাবে তার কোনো ভূমিকা বা সুযোগ ছিল না বলেও জানান ওয়াসার এমডি।
মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ অনুবিভাগের (ওয়াসা এই বিভাগের অধীন) অতিরিক্ত সচিব ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে কথা হয় কালবেলা প্রতিবেদকের। বিষয়টি তাকে অবহিত করে ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নই।’ কিছু জানতে হলে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রশ্ন লিখে পাঠানোর পরামর্শ দেন তিনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স