যুদ্ধ ছাড়া নেতানিয়াহুর টিকে থাকা কেন কঠিন
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৬-০৪-২০২৬ ১২:১৬:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৬-০৪-২০২৬ ১২:১৬:০৪ অপরাহ্ন
যুদ্ধ ছাড়া নেতানিয়াহুর টিকে থাকা কেন কঠিন
কিছু প্রজাতির হাঙর আছে, যাদের বেঁচে থাকতে হলে অবিরাম সাঁতার কাটতে হয়। থেমে যাওয়ার অর্থ মৃত্যু।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থাও যেন ঠিক তেমন। তাঁর রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার উপায় হলো যুদ্ধ।
এই যেমন পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্পর্কিত ভুয়া অভিযোগ তুলে ইরানের ওপর সবশেষ যুদ্ধটি চাপিয়ে দিয়েছেন নেতানিয়াহু। যৌথভাবে এই যুদ্ধ চালাতে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রলুব্ধ করেছেন।
নেতানিয়াহুর নিজস্ব যুদ্ধের ভার টানা ৪০ দিন টেনে চলেছেন ট্রাম্প। এরপর গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
কিন্তু এই যুদ্ধবিরতিতে নেতানিয়াহু নাখোশ। কারণ, তাঁর চাওয়া—যুদ্ধটা চলুক।
মন সায় না দিলেও ‘বুকে পাথর চাপা’ দিয়ে নেতানিয়াহুকে এই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি যাতে না হয়, সে চেষ্টায় কমতি রাখছেন না নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এমন চেষ্টার আলামত ইতিমধ্যে সামনে এসেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির অভিযোগ, গত সপ্তাহান্তে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলাকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের কাছে একটি ফোন আসে। ফোনটি করেন নেতানিয়াহু। তাঁর ফোনকলের পরই পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ভেস্তে যায় টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনা।
ইরানে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়েছে বলে তো আর নেতানিয়াহুর হাত গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। তাঁর জন্য প্রতিটি মুহূর্ত ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’। তাই তিনি তাঁর ‘ওয়ার মেশিন’ চালু রাখতে লেবাননে জোর হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, লেবাননে অব্যাহত ইসরায়েলি হামলা ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’। কিন্তু নেতানিয়াহু তা মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই হামলা চলবে।
এই যুদ্ধে ইরানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলা চলে আসছে। গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭২ হাজারের বেশি। আহত ১ লাখ ৭২ হাজার।
আঞ্চলিক আরও নানা ফ্রন্টে নেতানিয়াহুর ইসরায়েলের আগ্রাসন চলছে।
৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু সেই ইসরায়েলি নেতা, যাঁর অন্য যেকারও চেয়ে যুদ্ধটা খুব বেশি দরকার।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করার রেকর্ড নেতানিয়াহুর। কয়েক দফা মিলিয়ে তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কাল ১৮ বছরের বেশি।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন নেতানিয়াহু। সেই থেকেই তাঁর ক্ষমতা নড়বড়ে। তাঁর সুদীর্ঘ ক্ষমতার রাজনীতির ইতিহাসে একটা বিশেষ প্রবণতা সব সময় লক্ষ করা যায়। তিনি যখনই কোনো বড় সংকটে পড়েছেন, জনপ্রিয়তা খুইয়েছেন, পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন; ঠিক তখনই ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা–সংকটসহ যুদ্ধ-সংঘাতকে ‘রাজনৈতিক ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
এভাবেই নেতানিয়াহু বারবার বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল নিয়েছেন। আর এই কৌশল যে কাজে দিয়েছে, তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ ইসরায়েলের রাজনীতিতে তাঁর এখনো টিকে থাকা।
নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ফৌজদারি অপরাধের মামলা। বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি ও ঘুষগ্রহণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ইসরায়েলে তিনটি মামলার বিচার চলমান।
ইসরায়েলের ইতিহাসে নেতানিয়াহু প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী, যিনি ক্ষমতাসীন অবস্থায় বিচারের মুখোমুখি। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর কারাদণ্ড নিশ্চিত।
এসব মামলা নেতানিয়াহুকে সব সময় তাড়া করে বেড়ায়। এ অবস্থায় মামলাগুলোর বিচার বিলম্বিত করতে তিনি সদাতৎপর। আর মামলাগুলো ‘ভ্যানিশ’ হলে তো কথাই নেই। সেই চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তিন মামলায় নেতানিয়াহুর বিচার শুরু হয় ২০২০ সালে। তার পর থেকে তিনি নানা অজুহাতে বিচারপ্রক্রিয়া এড়াতে চাইছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার—যুদ্ধ।
গাজা যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে আদালতে মামলার শুনানি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস স্থগিত রাখতে সক্ষম হন নেতানিয়াহু।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেতানিয়াহু আদালতের কাছে আরজি জানান, তাঁর সাক্ষ্যগ্রহণ সপ্তাহে তিন দিনের বদলে যেন দুই দিনে নামিয়ে আনা হয়। কারণ, হিসেবে তিনি ‘দেশের ভবিষ্যৎ ঘিরে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির’ কথা উল্লেখ করেন। আদালত তাঁর এই আরজি মেনে নেন।
২০২৫ সালের মার্চে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করার পর নেতানিয়াহুর বিচারকার্যক্রম আবার স্থগিত হয়।
বিচার থেকে রেহাই পেতে নেতানিয়াহু এমন কিছু করছেন, যা নজিরবিহীন। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলি বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার উদ্যোগ।
আবার বিচার চলার মধ্যেই গত ৩০ নভেম্বর নেতানিয়াহু ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমার আবেদন করেন। অভূতপূর্ব এই ঘটনার ক্ষেত্রেও তিনি সেই ‘নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থের’ অজুহাত দেখিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ১২ দিন পর এক সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি যুদ্ধে পূর্ণ মনোযোগ দিতে তাঁর বিচার বন্ধের আবদার জানান।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির পর নেতানিয়াহুর বিচারকার্যক্রম আবার শুরুর ঘোষণা আসে। তড়িঘড়ি করে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে মামলার সাক্ষ্যদান অন্তত দুই সপ্তাহ স্থগিত করার আবেদন জানান।
বোঝাই যাচ্ছে, যুদ্ধ চললে নেতানিয়াহুর মনে স্বস্তি আসে। অন্তত জেলে যাওয়া তো এড়ানো যায়।
এ তো গেল বিচারের প্রসঙ্গ, ক্ষমতার রাজনীতিতেও নেতানিয়াহুর জন্য যুদ্ধ এক দারুণ ‘রক্ষাকবচ’।
২০২৬ সাল ইসরায়েলের নির্বাচনের বছর। আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা।
এই নির্বাচন সামনে রেখে প্রায় সব জনমত জরিপে আভাস দেওয়া হয়েছে, নেতানিয়াহুর অবস্থা মোটেই ভালো নয়। আসন্ন নির্বাচনে তিনি পরাজয়ের মুখে পড়তে পারেন।
নেতানিয়াহু এবার পরাজিত হলে তা তাঁর ‘রাজনৈতিক মৃত্যু’ ডেকে আনতে পারে। ফলে প্রধানমন্ত্রী পুনর্নির্বাচিত হতে, ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু মরিয়া।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ‘জুতসই’ উপায় হিসেবে নেতানিয়াহু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু করেন। চতুর নেতানিয়াহু নিজের স্বার্থ হাসিল সহজ করতে এই যুদ্ধে ট্রাম্পকে সহযোগী করেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কার্যক্রমের সিনিয়র কনসালটিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, ইরানের সঙ্গে বিস্তৃত পরিসরে যুদ্ধে জড়ানোকে একটি বড় বাজি হিসেবে নেন নেতানিয়াহু। কারণ, তিনি মনে করেছেন, এই যুদ্ধ তাঁর রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে। যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানে সরকার বদল ঘটানো গেলে নির্বাচনে তাঁর জয় নিশ্চিত হতে পারে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স