ঘুষ-দুর্নীতি, চোরাচালান ও জমি দখলে শত কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়: সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেন নয়নের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ।
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২২-০৪-২০২৬ ১২:১১:০৯ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
২২-০৪-২০২৬ ১২:১১:০৯ পূর্বাহ্ন
ঘুষ, দুর্নীতি, চোরাচালান, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সাধারণ মানুষের জমি দখলের মাধ্যমে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)-এ কর্মরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ সারোয়ার হোসেন (নয়ন)-এর বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের দাবি, সরকারি চাকরির সুযোগ কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
জানা যায়, নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়নের দমদত্তবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আজিম উদ্দিন সোনারের ছেলে সারওয়ার হোসেন নয়ন বাংলাদেশ কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে সাধারণ সিপাহী পদে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ পদোন্নতি পেয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হন। বর্তমানে তিনি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)-এ কর্মরত রয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই বদলে যেতে থাকে তার ভাগ্য। এক সময়ের ভাঙা টিনের ঘর ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। পাশাপাশি নিজ নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট, ভবন ও নগদ অর্থের মালিকানা গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ও বিশা ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজায় তার নামে-বেনামে অন্তত ১২০ বিঘার বেশি জমি রয়েছে। এর মধ্যে দমদত্তবাড়িয়া মৌজায় ৪৫ বিঘার বেশি, হিঙ্গুলকান্দি মৌজায় ১৫ বিঘা, বাহাদুরপুর মৌজায় ১৮ বিঘা, তেজনন্দী মৌজায় ২৫ বিঘা এবং লালপাড়া মৌজায় ১৭ বিঘা জমির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া নৈদিঘী, পৈসাওতা ও আশপাশের আরও কয়েকটি এলাকায় জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে।
শুধু গ্রামেই নয়, রাজধানীর বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং বহুতল ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রায়ই এলাকায় এসে প্রভাব দেখিয়ে বলেন—“আমার প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় হয়।”
অভিযোগ রয়েছে, নিজের অবৈধ সম্পদ আড়াল করতে তিনি পিতা আজিম উদ্দিন সোনার, ভাই আনোয়ার হোসেন (সেন্টু), মিজানুর রহমান (মিন্টু) ও আবুল কালাম আজাদের নামেও জমি ক্রয় করেছেন। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের নাম ব্যবহার করেও সম্পদ গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অর্থ ও প্রভাবের জোরে সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে মূল দলিল, ফাঁকা ব্যাংক চেক এবং একাধিক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে পরে অল্প মূল্যে জমি নিজের দখলে নেওয়া হয়েছে। অনেক কৃষক দাবি করেন, জীবনের সঞ্চয়ে কেনা জমি ও পৈতৃক সম্পত্তি হারিয়ে তারা নিঃস্ব হওয়ার পথে। কেউ কেউ দলিলপত্র ফেরত না পাওয়ায় ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
গ্রামের প্রবীণ আব্দুর রহমান বলেন, “নয়ন এখন এলাকার আতঙ্ক। টাকা আর ক্ষমতার জোরে মানুষের ভিটেমাটি কেড়ে নিচ্ছে।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বাসিন্দা বলেন, “সে বড় গাড়ি নিয়ে আসে, লোকজন নিয়ে ঘোরে। টাকা দিয়ে সব চুপ করিয়ে দেয়। আমরা ভয়ে কিছু বলি না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, সারওয়ার হোসেন নয়ন এলাকায় “নয়ন বাহিনী” নামে একটি গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। এই বাহিনীর সদস্যরা তার পক্ষে ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিরোধীদের হুমকি এবং জমি দখল সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষ একপ্রকার জিম্মি হয়ে আছেন।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বকালীন সময়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক বিদেশি পণ্য ও স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আত্রাই উপজেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। সেই সুবাদে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্যসহ একাধিক প্রভাবশালী এমপি-মন্ত্রীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রভাব ব্যবহার করেই দীর্ঘদিন প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে স্থানীয় আদালতে একাধিক মামলা দায়ের এবং কিছু জমির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে বলেও জানা গেছে। ফলে তার দখলে থাকা বেশ কিছু জমি বর্তমানে আইনি জটিলতার মধ্যে রয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার আয়-ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ ও জমি ক্রয়ের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, সমসপাড়া বাজারের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে তার নামে নিয়মিত বড় অঙ্কের লেনদেন হয়। প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্য নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, একজন সরকারি কর্মচারীর স্বাভাবিক বেতন-ভাতার বাইরে এ ধরনের বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া গুরুতর সন্দেহের জন্ম দেয়। নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, সরকারি চাকরির আড়ালে দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার ও সম্পদ দখলের মাধ্যমে যারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেন নয়নের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে তার ব্যবহৃত নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স