ঢাকা , শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ , ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিমলায় নাম ও পরিচয়ের গোলকধাঁধায় নুর হোসেন; কখনো মুক্তিযোদ্ধা, কখনো ভিন্ন পিতার সন্তান!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ০৪:১৯:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ০৪:১৯:০৮ অপরাহ্ন
ডিমলায় নাম ও পরিচয়ের গোলকধাঁধায় নুর হোসেন; কখনো মুক্তিযোদ্ধা, কখনো ভিন্ন পিতার সন্তান! পরিচয় জালিয়াতি ও নথিপত্র জালিয়াতি


মোঃ লিখন ইসলাম, (নীলফামারী প্রতিনিধি) 


নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় পরিচয় জালিয়াতি ও নথিপত্র জালিয়াতির এক অবিশ্বাস্য ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। মোঃ নুর হোসেন ছাত্তার নামের এক ব্যক্তি একেক দপ্তরে একেক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে বিভ্রান্ত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), জমির দলিল, জন্মনিবন্ধন এবং স্বঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা কার্ডে বাবার নামের কোনো মিল নেই। একই ব্যক্তির তিন থেকে চারজন ভিন্ন পিতার নাম ব্যবহারের এই ঘটনা এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

 অনুসন্ধানী দলের হাতে আসা নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অভিযুক্ত নুর হোসেন ছাত্তার অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন প্রয়োজনে তার পিতৃপরিচয় পরিবর্তন করেছেন।
তার একটি এনআইডিতে নাম রয়েছে মোঃ নুর হোসেন ছাত্তার, পিতা-জব্বার মুন্সি। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি অন্য জায়গায় যে এনআইডি তথ্য ব্যবহার করছেন, সেখানে বাবার নাম হিসেবে উল্লেখ রয়েছে মৃত আঃ রহমান মুন্সি।
নুর হোসেন যখন জমি বিক্রি করেছেন, তখন সেখানেও তিনি সত্য গোপন করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। দলিলে তিনি নাম লিখেছেন মোঃ আব্দুস ছাত্তার (নুর হোসেন) এবং সেখানে পিতার নাম ব্যবহার করেছেন মৃত অবির উদ্দিন। প্রশ্ন উঠেছে, এনআইডির বাবার নামের সাথে দলিলের বাবার নামের মিল না থাকলে সেই দলিলের আইনগত ভিত্তি কতটুকু? 

সবচেয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি ধরা পড়েছে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে। জানা গেছে, কোনো গেজেট বা সরকারি সনদ ছাড়াই কম্পিউটারের দোকান থেকে ৫০-১০০ টাকার বিনিময়ে একটি কার্ড তৈরি করে তিনি নিজেকে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করছেন। সেই কার্ডে তার নাম নুর হোসাইন এবং পিতার নাম আবদুল রহমান মুন্সি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেওয়া এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য তিনি এই পরিচয় পরিবর্তনের আশ্রয় নিয়েছেন। বিশেষ করে নিজেকে 'বীর মুক্তিযোদ্ধা' প্রমাণের জন্য তিনি বারবার পিতার নাম পরিবর্তন করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এলাকার সচেতন মানুষ বলছেন, "একই ব্যক্তির তিন-চারজন পিতা হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটি স্পষ্টত একটি বড় ধরণের প্রতারণা চক্রের কাজ।"

অনুসন্ধান চলাকালীন মোঃ আব্দুস ছাত্তার (নুর হোসেন) এর ভাই মোঃ রশিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় তাদের পিতার নাম অবির উদ্দিন। নামের অসঙ্গতি নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রশিদুল বলেন, "সে আমার ভাই, তার নাম মোঃ আব্দুস ছাত্তার (নুর হোসেন) এবং আমাদের বাবার নাম অবির উদ্দিন, কিন্তু সে দীর্ঘদিন থেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় বানাতে গিয়ে একাধিকবার বাবার নাম পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে বলে আমি শুনেছি।" 

বাবার নামের এই বিশাল অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অভিযুক্ত নুর হোসেন ছাত্তার তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি বলেন, "কাগজপত্রে কিছু ভুল থাকতে পারে। অনেক আগে দলিল হয়েছে, তখন হয়তো বাবার নাম অবির উদ্দিন লেখা হয়েছিল।" (তবে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করার বিষয়ে জানতে ও সরকারি পরিচয়পত্র জালিয়াতি করা যে অপরাধ, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি)।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাসেম অনুসন্ধানী টিমকে বলেন "মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্বের জায়গা। ৫০-১০০ টাকা দিয়ে কার্ড বানিয়ে কেউ যদি মুক্তিযোদ্ধা সাজে, তবে তা শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি। আমরা চাই প্রশাসনের মাধ্যমে এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।"

ডিমলা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা সালাউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, "দলিল সম্পাদনের সময় এনআইডির সাথে তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক। যদি কেউ ভুল পিতৃপরিচয় দিয়ে জমি বিক্রি করে, তবে সেই দলিল বাতিলযোগ্য। এটি সরাসরি জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলা যোগ্য অপরাধ।"

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “একজন ব্যক্তি যখন একাধিক পরিচয় ব্যবহার করেন, তখন তা গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ভুয়া পরিচয়ে কার্ড তৈরি এবং সরকারি প্রতীক ব্যবহার করা হলে তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায়ও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”

একজন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন নামের আড়ালে বড় কোনো ভূমি দস্যুতা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে কম্পিউটারের দোকানে সরকারি লোগো ব্যবহার করে ভুয়া কার্ড তৈরির বিষয়টি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় তদন্ত হওয়া জরুরি।

রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র এবং পবিত্র মুক্তিযোদ্ধা খেতাব নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার শেষ কোথায়? নুর হোসেন ছাত্তারের এই ‘বহুরূপী’ পরিচয়ের রহস্য উন্মোচন এখন সময়ের দাবি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ