ঢাকা , শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ , ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান শুরু

গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান শুরু

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ০৬:২৫:৫১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ০৬:২৫:৫১ অপরাহ্ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান শুরু গণপূর্ত অধিদপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান শুরু

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত গণপূর্ত অধিদপ্তর–এ এবার একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্পের কাজ না করেই বিল উত্তোলন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং ভুয়া বিল পাসের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। টেন্ডার সিন্ডিকেট গঠন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ও শর্তে কারসাজির ঘটনাও দীর্ঘদিনের বলে জানা গেছে।

এছাড়া, কাজের কার্যাদেশ প্রদান, বিল অনুমোদন এবং নিরাপত্তা জামানত ফেরতের ক্ষেত্রেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনদের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে কাজ বণ্টনের অভিযোগও উঠেছে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সাবেক ও বর্তমান একাধিক প্রকৌশলীর বিপুল সম্পদের তথ্য মিলেছে বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

অভিযোগের তালিকায় বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে, যার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আছেন। বিশেষ করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা তা অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে ব্যাপক বদলির ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। একাধিক প্রকৌশলীর হঠাৎ বদলি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কিছু বদলির আদেশ বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সার্বিক পরিস্থিতিতে, সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দুদকের এই অনুসন্ধান কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, তা এখন দেখার বিষয়। 

 

এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ভেরিয়েশন সুবিধা ঠিকাদার নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আবু নাসের চৌধুরীর একাধিক প্লট ফ্ল্যাট রয়েছে।

ঢাকা সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বদরুল আলম : তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। নিজেকে নতুন রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি। বর্তমান সচিব মো. নজরুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘বৃহত্তর কুমিল্লা’ পরিচয়ের সূত্র ধরে সচিবালয়ে বিশেষ প্রভাব রয়েছে তার। ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকার কিছু ঠিকাদারকে নিয়ে শক্তিশালী একটি গ্রুপ গড়ে তুলেছেন বদরুল। এই গ্রুপকে কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ওপর ফোনে ও সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ ব্যাপারে বদরুল আলম খান বলেন, “প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকে আমাকে দূরে সরাতে একটি মহল সক্রিয়। আমি ভালো কাজ করছি বলেই অপপ্রচার চলছে। সিন্ডিকেট, চাপ প্রয়োগ বা ঠিকাদারি ব্যবসার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন এসব ভিত্তিহীন।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান : গণপূর্ত অধিদপ্তরে নিয়োগ বদলি বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান। কর্মকর্তা কর্মচারী বদলির নামে হয়রানি ও কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ৩ মার্চ একই দিনে পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপনে অর্ধশতাধিক প্রকৌশলী বদলি করেন চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। অথচ এত বেশি সংখ্যক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী বদলির বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন না মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমনকি সচিবও। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ত ভবনের একটি সিন্ডিকেট এই বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বিষয়টি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টিতে এলে প্রধান প্রকৌশলীকে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি একসঙ্গে এত প্রকৌশলী বদলির বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে এসব বদলির আদেশ বাতিলের নির্দেশ দেন। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে বদলি বা পদোন্নতির কোনো ফাইল অগ্রগামী না করার নির্দেশ দেন। সাধারণত প্রধান প্রকৌশলী তার অধিদপ্তরের কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করতে পারেন। মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনার কারণে এখন থেকে এসব পদে বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সচিবের কাছ থেকে মৌখিক অথবা লিখিত পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

গণপূর্ত সূত্র জানিয়েছে, চূয়াডাঙ্গার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহসীনকে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী জেড়াল্ড অলিভার গুডাকে রিজার্ভে, নির্বাহী প্রকৌশলী (রিজার্ভ) মো. আতিকুল ইসলামকে মাগুরা, খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী সোমেন মল্লিককে রিজার্ভে, প্রেষণ থেকে প্রত্যাগত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিয়াদুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর (সংস্থাপন) দপ্তরে সংযুক্ত, রিজার্ভের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুস্তাফিজুর রহমানকে গাইবান্ধা গণপূর্ত বিভাগে, প্রেষণ প্রত্যাগত শাহিনুর ইসলামকে চুয়াডাঙ্গা গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়। গণপূর্ত প্রকল্প বিভাগ-৫-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিমেল দাসকে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এ, গণপূর্ত প্রকল্প বিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুষমা আপ্লুত আরা ফেরদৌসকে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপবিভাগ-৭-এ, নরসিংদী গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদ আল আজাদকে মিরপুর গণপূর্ত উপবিভাগ-১-এ, রংপুর গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হুসাইন মো. সাফী মণ্ডলকে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এ, বগুড়া গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামকে ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৫-এ, রাজশাহী গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কাওসার সরকারকে মেডিক্যাল কলেজ গণপূর্ত উপবিভাগে এবং মানিকগঞ্জ গণপূর্ত উপবিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদকে রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-২-এ বদলি করা হয়। চট্টগ্রাম গণপূর্ত উপবিভাগ-৯-এর মো. আনিসুল হককে কাপ্তাই গণপূর্ত উপবিভাগে, গণপূর্ত ডিজাইন বিভাগ-৩-এর মো. রুবাইয়াত হোসেনকে গণপূর্ত ডিজাইন বিভাগ-১০-এ, গাজীপুর গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এর মো. ইফতেখারুল ইসলামকে গণপূর্ত জরিপ উপবিভাগ-২-এ, গাজীপুর গণপূর্ত উপবিভাগ-১-এর মো. মামুনুর রশিদকে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপবিভাগ-৪-এ, গাইবান্ধা গণপূর্ত উপবিভাগের মো. আব্দুস সাত্তারকে নওগাঁ গণপূর্ত জরিপ উপবিভাগে, চট্টগ্রাম গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-৩-এর পুষণ চক্রবর্তীকে খাগড়াছড়ি গণপূর্ত জরিপ উপবিভাগে, লালমনিরহাট গণপূর্ত উপবিভাগ-১-এর মো. জাকির হোসেনকে মিরপুর গণপূর্ত উপবিভাগ-১-এ এবং প্রেষণ প্রত্যাগত মোহাম্মদ রিশাদ উন নবীকে চট্টগ্রাম গণপূর্ত উপবিভাগ-৮-এ বদলি করা হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে বদলির আদেশগুলো বাতিল করা হয়েছে। তিনি একটু ধীরে চলতে বলেছেন। আমি তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি।


নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ