আমলাতন্ত্রে ‘স্পিড রেকর্ড’? তবিবুর কাণ্ডে চাঞ্চল্য
বাংলাদেশের প্রশাসনে সচরাচর যে ধীরগতি ও জটিলতার কথা শোনা যায়, তার সম্পূর্ণ উল্টো এক ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর-এ। অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে এক কর্মকর্তার বরখাস্ত, আবেদন, তদন্ত এবং পুনর্বহালের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় বিস্ময় তৈরি হয়েছে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে এবং জনস্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বেশিদিন টেকেনি। বরখাস্তের মাত্র দুই দিন পর, ১২ এপ্রিল, তবিবুর রহমান সরাসরি প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। তিনি পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়ে নিজেকে নির্দোষ বলে উল্লেখ করেন। আবেদনটি যায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম-এর কাছে, এবং সেখানে দ্রুতই নড়াচড়া শুরু হয়।
এরপর মাত্র সাত কর্মদিবসের ব্যবধানে নাটকীয় মোড় নেয় পুরো ঘটনা। ২২ এপ্রিল একই সচিব নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে আগের বরখাস্ত আদেশ বাতিল করে তবিবুর রহমানকে তাঁর পদে পুনর্বহাল করা হয়। এমনকি বরখাস্তকালীন সময়কেও চাকরির অংশ হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই দ্রুততার কারণেই শুরু হয়েছে প্রশ্নের ঝড়। প্রশাসনের ভেতরের অনেক কর্মকর্তাই বলছেন, এত অল্প সময়ে একটি বিভাগীয় মামলা দায়ের, তদন্ত এবং নিষ্পত্তি হওয়া প্রায় নজিরবিহীন। আরও বিস্ময়ের বিষয়, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি কবে গঠন হলো, কারা ছিলেন, কীভাবে কাজ করলেন—এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা সরাসরি প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা আচরণবিধির পরিপন্থী। তাঁর মতে, পুরো প্রক্রিয়াটিই নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঘটনার আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে। তবিবুর রহমান বড় দুটি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, যেগুলোতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অতীতে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পরবর্তী দ্রুত অব্যাহতি—দুইই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনাকে অনেকেই প্রশাসনিক ‘দ্রুততার রেকর্ড’ হিসেবে দেখছেন—তবে সেই দ্রুততা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি অন্য কোনো প্রভাব কাজ করেছে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে কয়েকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে:
মাত্র ৭ কর্মদিবসে:
👉 প্রশাসনে সাধারণত এসব প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ হয়। তাই এটাকে “অস্বাভাবিক” বলা হচ্ছে।
👉 অধিদপ্তরের ভেতরের কর্মকর্তারাও কিছু জানেন না—এটা বড় অস্বচ্ছতার ইঙ্গিত।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেছেন:
👉 এত দ্রুত সিদ্ধান্ত বদল হওয়া প্রশ্ন তৈরি করে।
👉 প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী এটা অস্বাভাবিক।
এই ঘটনা শুধু একজন কর্মকর্তার নয়, বরং:
—এই বড় প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে আসে।