ঢাকা , শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অন্ধকার গিলে খাচ্ছে আগামীকে।

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৬-০৬-২০২৬ ০৬:৩৭:০৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৬-০৬-২০২৬ ০৬:৩৭:০৯ অপরাহ্ন
অন্ধকার গিলে খাচ্ছে আগামীকে। নিষ্পাপ স্বপ্নগুলোকে
মাহফুজুর রহমান : একটি ফুটফুটে শিশু যখন জন্ম নেয়, মা-বাবার চোখে তখন থাকে হাজারো স্বপ্নের বুদবুদ। বড় হয়ে ছেলেটি ডাক্তার হবে, মেয়েটি হবে ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা দেশের হাল ধরবে। কিন্তু ঢাকার অলিগলিতে আজ যে মরণনেশার জাল বিছানো রয়েছে, তা প্রতিনিয়ত চিবিয়ে খাচ্ছে সেই নিষ্পাপ স্বপ্নগুলোকে। ফুলের মতো পবিত্র, আগামী দিনের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যে তরুণ প্রজন্ম, তারা আজ অবলীলায় পা বাড়াচ্ছে এক অন্ধকার নরকে। অথচ যাদের এই বিষাক্ত চক্র উপড়ে ফেলার কথা, তাদেরই একটি অংশের হাত মেলানোর গুঞ্জনে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে মূল হোতারা। গোটা ঢাকা শহর আজ যেন মাদকের এক অদৃশ্য চাদরে ঢাকা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়শই অভিযান চালাচ্ছে, উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, আইস বা গাঁজার চালান। গ্রেফতার হচ্ছে খুচরা বিক্রেতা কিংবা চুনোপুঁটি মাদকসেবীরা। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো এই ব্যবসার পেছনে থাকা মূলহোতা বা গডফাদাররা কোথায়? তারা কেন সবসময় থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে? সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও সচেতন মহলের অভিযোগ, আড়ালে থাকা এই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সবসময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলে কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও তাদের তথাকথিত ‘সোর্স’। অসাধু কর্মকর্তা, সোর্স এবং মাদক সিন্ডিকেটের এই ত্রিভুজ রসায়ন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ফলে বড় কোনো অভিযানের পরিকল্পনা হলেই সেই তথ্য আগেভাগেই পৌঁছে যায় ‘মাদক কর্তা বাবুদের’ কাছে। তারা নিরাপদে সরে যায়, আর পুলিশের খাতায় জমা হয় কেবল কিছু খুচরা বিক্রেতা গ্রেফতারের পরিসংখ্যান। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের চোখের সামনেই এখন হাত বাড়ালে মিলছে মরণনেশা। বন্ধুদের আড্ডায় স্রেফ কৌতূহলবশত যে ছেলেটি প্রথমবার মাদকে টান দিয়েছিল, কয়েক মাস পর সেই হয়ে উঠছে পুরোদস্তুর মাদকসেবী। মাদকের এই বিপুল অর্থের জোগান দিতে গিয়ে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা বেছে নিচ্ছে অপরাধের পথ। চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে পাড়ার ‘কিশোর গ্যাং’ এর মতো ভয়ঙ্কর সব বাহিনীতে নাম লেখাচ্ছে তারা। সমাজ যেন এক গভীর অন্ধকারের দিকে নিমজ্জিত হতে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়বে, মুখ থুপড়ে পড়বে দেশের ভবিষ্যৎ। আমরা আসলে কোন বাংলাদেশের দিকে এগোচ্ছি? যে তরুণদের হাত ধরে ইতিহাস লেখার কথা, তারা যদি মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, তবে নতুন করে ধ্বংসের ইতিহাস লেখা হবে এই জনপদে। সমাজবিজ্ঞানীদের শঙ্কা। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। চাকরির পাশাপাশি একটু বাড়তি আয়ের আশায়, সামান্য কিছু ‘উপরের টাকার’ লোভে যে অসাধু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আজ চোখ বন্ধ করে রাখছেন, তারা হয়তো ভাবছেন নিজের পরিবার তো নিরাপদ। কিন্তু নিয়তির পরিহাস বড় নির্মম। যে টাকার লোভে আজ দেশের ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, সেই অবৈধ টাকার উত্তাপেই একদিন হয়তো পুড়ে ছাই হয়ে যাবে খোদ ওই কর্মকর্তার নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ। জীবনের সবটুকু বিলিয়ে, রাজপ্রাসাদ গড়ে দিলেও লাভ হবে না, যখন দেখা যাবে নিজের সন্তানই জড়িয়ে গেছে অন্ধকারের কোনো অতল গহ্বরে। সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ থাকবে না, ধ্বংস হয়ে যাবে পুরো পরিবার। আজ সময় এসেছে জোরালোভাবে প্রশ্ন তোলার। এই মাদকের ছোবল থেকে আমাদের সন্তানদের বাঁচাবে কে? শুধু লোকদেখানো অভিযান কিংবা চুনোপুঁটি ধরে কি এই মহামারি রোখা সম্ভব? প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কালো ভেড়াদের চিহ্নিত করে উপড়ে ফেলতে না পারলে, এবং গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনলে এই রাজধানী অচিরেই এক জীবন্ত কবরস্থানে পরিণত হবে। শহরের প্রতিটি মা-বাবার এখন একটাই আর্তনাদ আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে দিন, আমাদের আগামীকে বাঁচান।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ