গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২ লাখ টাকা বেশি দরদাতাকে কাজ! জিসিসির টেন্ডার বিতর্কে আলোচনায়
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৬-০৬-২০২৬ ০৪:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৬-০৬-২০২৬ ০৪:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন
সুদীপ বসাক
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) একটি ডাস্টবিন নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক। প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকার এ প্রকল্পে বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অধিক দরদাতা একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুসরণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর জোনে ডাস্টবিন নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্পটির টেন্ডার আইডি ১২৬৬৩৩৭। গত ২৪ মে ই-জিপি পদ্ধতিতে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মোট আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সরকারি ইলেকট্রনিক প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থার আওতায় দরপত্র জমা ও মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার কথা, যার মূল উদ্দেশ্য ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং মানবিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনা।
দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সানফাই কনস্ট্রাকশন সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব করলেও নির্ধারিত সিগনিফিক্যান্টলি লো প্রাইজড টেন্ডার (এসএলটি) সীমার নিচে দর দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়। এরপর বৈধ দরদাতাদের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, যার দর ছিল ২ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার ২৭৯ টাকা।
তবে অভিযোগ রয়েছে, পিপিআর অনুযায়ী বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার পরিবর্তে অধিক দর প্রস্তাবকারী মেসার্স আব্দুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির দর শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তুলনায় প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা বেশি।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কেন বাদ দেওয়া হলো এবং অধিক দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করার পেছনে কী যুক্তি ছিল।
দরপত্র-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক প্রভাব কাজ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের সঙ্গে কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে এবং সেই সম্পর্কের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি সুবিধা পেয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশ্যে আসেনি।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, দরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ছিল। কারণ ই-জিপি ব্যবস্থায় দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি-বিধান অনুসরণ বাধ্যতামূলক। সেই নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক টেন্ডার বিতর্কের পাশাপাশি সুদীপ বসাকের অতীত কর্মজীবন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দায়িত্ব পালনকাল থেকে শুরু করে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, সরকারি অর্থ অপচয় এবং মাস্টাররোল কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া যন্ত্রপাতি ভাড়া, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দোকান বরাদ্দ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতেও তাঁর নাম উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত বা তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি।
২০২২ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে যোগদানের পরও তাঁকে ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে মাস্টাররোল কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, অতিরিক্ত বিল প্রদর্শন, ভুয়া ভাউচার এবং কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। যদিও এসব অভিযোগ তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিল অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ফলে এসব পদে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে।
সরকারি ক্রয়বিধি বিশেষজ্ঞদের মতে, দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ও লিখিত ব্যাখ্যা থাকা আবশ্যক। বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়া হলে তার কারণ নথিভুক্ত থাকতে হবে এবং তা বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এ বিষয়ে ৫ নম্বর জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু হানিফ বলেন, দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে তিনি ছুটিতে ছিলেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন। তাঁর এ বক্তব্যের পর প্রকল্পটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কারা ভূমিকা রেখেছেন, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফোন কল ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
তবে সুদীপ বসাকের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ও সমর্থক অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছেন এবং একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
তাঁদের দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আদালত বা তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। বরং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পেছনে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।
তবে সাম্প্রতিক দরপত্র বিতর্ক পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ এখানে শুধু অতীতের অভিযোগ নয়, বরং চলমান একটি প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত। যদি বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতাকে যথাযথ কারণ ছাড়া বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা সরকারি অর্থের সাশ্রয় ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় ব্যবস্থার মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের কাছে যদি যথাযথ কারণ থাকে, তাহলে তা প্রকাশ করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারি অর্থ ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিন নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক এখন বৃহত্তর একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত হচ্ছে। এর উত্তর মিলবে কেবল নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স