ঢাকা , সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ , ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রূপালী ব্যাংকে ‘ফ্যাসিবাদের ছায়া’ এখনো বহাল? এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, বৈষম্য ও অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২০-০৬-২০২৬ ০৮:৪০:৪৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২০-০৬-২০২৬ ০৮:৪০:৪৬ অপরাহ্ন
রূপালী ব্যাংকে ‘ফ্যাসিবাদের ছায়া’ এখনো বহাল? এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, বৈষম্য ও অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ কাজী মো.ওয়াহিদুল ইসলাম
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসিতে প্রশাসনিক বৈষম্য, প্রতিহিংসামূক বদলি, পদোন্নতি বঞ্চনা, আর্থিক অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী মো.ওয়াহিদুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরও ব্যাংকের অভ্যন্তরে পুরোনো প্রভাব বলয় বহাল রেখে তিনি ভিন্নমতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর ‘স্টিম রোলার’ চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাংকের জাতীয়তাবাদী ঘরানার সংগঠন ‘রূপালী ব্যাংক জিয়া পরিষদ’-এর অভিযোগ, এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার পরপরই সংগঠনের শীর্ষ তিন নেতাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে, যা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। স্মারকলিপির পরই বদলি : সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, গত ৪ জুন অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে এমডি'র বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রশাসনিক বৈষম্য, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তাকে অপসারণের দাবি জানানো হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক মো. গোলাম সারোয়ারকে ফরিদপুর, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এ এস এম নিয়াজ মোর্শেদকে ময়মনসিংহ এবং সদস্যসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে কুমিল্লায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়। জিয়া পরিষদের অভিযোগ, একই আদেশে অন্য কর্মকর্তাদের রিলিজের সময় নির্ধারণ করা হলেও তাদের তিন নেতাকে অবিলম্বে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক। ব্যাংককে শত শত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে’ স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, ‘খারাপ ব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও অনিয়মের’ কারণে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত রূপালী ব্যাংক প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে রূপালী ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি ও ক্রীড়া পরিষদের নামে অর্থ অপব্যবহার, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন ও পদোন্নতি এবং বিরোধী মতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তোলা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বর্তমান এমডির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি বঞ্চনা, দূরবর্তী স্থানে বদলি এবং নানামুখী প্রশাসনিক চাপে রয়েছেন। ‘নিজস্ব বলয়’ গড়ে তোলার অভিযোগ : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, এমডির আশপাশে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, বদলি ও পদোন্নতিকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এই বলয়ের সদস্যদের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। তাদের ভাষায়, “ব্যাংক পরিচালনার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন ব্যবহৃত হচ্ছে, যা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্বেগজনক।” পদোন্নতি চাওয়ায় শাস্তির অভিযোগ জানা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে পদোন্নতির আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২২ এপ্রিল কয়েকজন কর্মকর্তা আবেদন নিয়ে এমডির কাছে যান। অভিযোগ রয়েছে, এরপর ৪৪ জন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, আটজনকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি এবং ১২ জনকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। 'ফ্যাসিবাদী কায়দায় ব্যাংক পরিচালনা’ রূপালী ব্যাংক জিয়া পরিষদের সভাপতি মো. গোলাম সারোয়ার বলেন, “এমডির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর জবাব না দিয়ে উল্টো সংগঠনের নেতাদের হয়রানি করা হচ্ছে। যোগদানের পর থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করছেন। দূর-দূরান্তে বদলি, পদোন্নতি বঞ্চনা এবং পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি কার্যত ফ্যাসিবাদী ধারারই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।” এমডির বক্তব্য: ‘ষড়যন্ত্র চলছে’ অভিযোগের বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, “একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে। ষড়যন্ত্র করে কেউ কিছু করতে পারবে না।” রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল হুদা ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে পারেননি। অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক বলেন, “ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে দিলে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।” এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অর্থ প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এমপির সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি একাধিক মিটিং এ থাকায় তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংককে ঘিরে এমন গুরুতর অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে রূপালী ব্যাংকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? আর্থিক খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ