ঢাকা , শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ , ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক নাফরিজা শ্যামার ‘ডলার বাণিজ্য’ কমিশন নিয়ে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ, কাজ না করেই বিল তোলার পায়তারা!

লিটন আলী
আপলোড সময় : ২৫-০৬-২০২৬ ১২:৫১:২১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৫-০৬-২০২৬ ১২:৫১:৪৫ অপরাহ্ন
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক নাফরিজা শ্যামার ‘ডলার বাণিজ্য’ কমিশন নিয়ে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ, কাজ না করেই বিল তোলার পায়তারা! নাফরিজা শ্যামা


দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই বিল দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। কাজ না করেই বিল তুলে ভাগাভাগিতে জড়িত খোদ এই প্রকল্পের পরিচালক নাফরিজা শ্যামা। যিনি কাজ শুরুর আগেই ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর বিদেশ সফরে এই কমিশনের অর্থ ডলারে দিতে হবে বলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা তুলেছেন গণপূর্তের এক নির্বাহী প্রকৌশলী।

সম্প্রতি দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশের দুটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এর মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দেয়া হয় ৩০০ কোটি টাকার আসবাবপত্র সরবরাহের দায়িত্ব। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা বিভাগ-১ সম্প্রতি তড়িঘড়ি করে দেড়শ’ কোটি টাকার টেণ্ডার আহ্বান করে। যাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগ-২ থেকেও এ কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা হলেও এখন পর্যন্ত শেষ করা হয়নি।

আগামী ৩০ ‍জুন চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছর আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও এর পেমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে ২৩ জুনের মধ্যে। যেখানে এই কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়নি সেখানে তড়িঘড়ি করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করেন এই প্রকল্পের পরিচালক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাফরিজা শ্যামা। সম্প্রতি তিনি আমেরিকা সফর করেন। 

এর আগেই এই অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। আসবাবপত্র সরবরাহ তো দূরের কথা যেখানে টেন্ডার প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়নি সেখানে কেনো তিনি তড়িঘড়ি করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছেন, সাধারণত: এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে অনানুষ্ঠানিক সম্মান জানানোর রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অর্থ বরাদ্দের জন্য প্রকল্প পরিচালক না-কি  তিন পার্সেন্ট হারে টাকা নিয়েছেন বলে গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। বিশেষ করে এর দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী তাঁর নাম করে দরপত্রে অংশ নেয়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে এ হারেই টাকা তুলেছেন। একটি বড় ফার্নিচার কোম্পানি এতো বেশি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দরপত্রে তারা যেখানে ৮টিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে,সেখানে তাদের মাত্র ১টি কাজ দেয়া হয়েছে।

ওই নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারদের জানিয়েছেন, প্রকল্প পরিচালক ম্যাডাম বিদেশ সফরে যাবেন তাকে ডলারে পেমেন্ট দিতে হবে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক নাফরিজা শ্যামার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বলেন, আমি তো বিদেশ সফর শেষ করে এসেছি। কাজ শুরুর আগেই গণপূর্তকে কেনো ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন কথা বলতে চাননি। এটা কোন অনিয়ম না বলেই তিনি ফোন কেটে দেন। পরে আবার ফোন করলে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, সরকারি ছুটির দিনেও আপনাদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। এই বলে তিনি তাঁর মোবাইল বন্ধ করে দেন। শনিবার সারাদিনও তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ইতিমধ্যেই অবহিত হয়েছেন এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। প্রথমে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ও ইএম-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হককে মন্ত্রণালয়ে তলব করে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন। পরে জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁর কার্যালয়ে এ নিয়ে আবার ব্যাখ্যার জন্য ডেকেছিলেন মন্ত্রী। সেখানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী মন্ত্রীকে জানিয়েছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোন অনিয়ম ও ‍দুর্নীতি হয়নি। 

টেকনিক্যাল জ্ঞান না থাকায় প্রকৌশলীদের এই ব্যাখ্যাই তিনি মেনে নিয়েছেন। অথচ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পরতে পরতে প্রকাশ্য দিবালোকের মতো দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট।
গত ৮ জুন পর্যন্ত আহ্বান করা মোট ১২টি দরপত্রের ৮টিতেই সর্বনিম্ন দরদাতা হয় দেশের সবচেয়ে নামকরা ফার্নিচার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘হাতিল ফার্নিচার’। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এর মধ্য থেকে মাত্র ১টি কাজের কার্যাদেশ দিলেও বাকি ৭টি কাজের আদেশ ঝুলিয়ে রাখে মুলত গণপূর্তের প্রকৌশলী ত্রয়ের অতিরিক্ত অর্থ দাবির আবদার মেটাতে না পারায়।

এই বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত: আচরণ পেতে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম গত ৮ জুন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রকৌশলী (ই/এম) জোন আশ্রাফুল হকের কাছে আবেদন করেন।

সেখানে তিনি জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক থেকে শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অভিযোগ করেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের কাছেও। মন্ত্রী বিষয়টি আমলে নিয়ে গণপূর্তের প্রকৌশলীদের তলব করলেও প্রকৌশলীরা মন্ত্রীকে ‘ভুল’ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আর তাতেই সন্তষ্ট হয়েছেন তিনি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ