পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রত্যয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এসএম হেমায়েত জাহান
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৬-০৬-২০২৬ ০৪:৪১:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৬-০৬-২০২৬ ০৪:৪১:৫৩ অপরাহ্ন
গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধের
*এম. রহমান*
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইট-পাথর আর স্থাপনার সমষ্টি নয়; এটি স্বপ্ন, জ্ঞান, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত ঠিকানা, যেখানে নির্মিত হয় একটি জাতির ভবিষ্যত। সাগরবিধৌত দক্ষিণ বাংলা তথা দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার গর্ব, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও দীর্ঘ পথচলায় সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার নানা অধ্যায় পেরিয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে।সাবেক ৩ বারের সফল প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের জনগণের প্রতি ভালবাসার নিদর্শনস্বরুপ ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী সরকারী প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাস্তবরুপ লাভ করে। কৃষি, মৎস্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে ‘দক্ষিণবঙ্গের অক্সফোর্ড’খ্যাত এই বিদ্যাপীঠ এখন স্বপ্ন দেখছে আরো উচ্চ পরিসরে বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার। আর সেই স্বপ্নযাত্রার নেতৃত্বে এসেছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান। তাঁর আগমন যেন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনা নয় বরং নতুন প্রত্যয়, নতুন আলোর অভিযাত্রা এবং এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
দিনটি ছিল গত ১০ জুন। দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে সেদিন যেন ভোরের আলো একটু অন্যরকম ছিল। প্রকৃতিও যেন সেজেছিল এক অনির্বচনীয় আনন্দের রঙে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) সবুজে ঘেরা প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসজুড়ে বিরাজ করছিল উৎসবের আবহ, যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে ফিরে আসছে কোনো প্রিয়জন, শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক স্বপ্নযাত্রার মহাকাব্য। দিনটিকে ঘিরে যেন পুরো ক্যাম্পাস জেগে উঠেছিল নতুন সাজে। রঙ-বেরঙের বেলুন, ফেস্টুন আর আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছিল প্রতিটি প্রান্তর।
শিক্ষার্থীদের তুলির আঁচড়ে প্রধান সড়কগুলো রঙিন আল্পনায় হয়ে উঠেছিল যেন এক বিশাল ক্যানভাস। লাল, নীল, সবুজ আর সোনালি আলোর মালায় সজ্জিত রাস্তার দুই ধারে উড়ছিল নানা বর্ণের পতাকা- যেন বাতাসও আনন্দের ভাষা শিখে নিয়েছে। দিনের আলোয় ঝলমল করছিল ক্যাম্পাস, আর রাত নামতেই লাল-নীল-সবুজ বাতির মায়াবী ঝলক যেন নিঃশব্দে ঘোষণা করছিল প্রিয় ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়ের আগমনের মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। গ্রীষ্মের আগমনী বার্তায় প্রকৃতিও যেন আনন্দ-উৎসবে শরিক হয়েছিল। ক্যাম্পাসজুড়ে ফুটে থাকা কদম, বকুল, রক্তজবা, বেইলি আর সোনালুর সোনালি ঝর্ণাধারা, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আবেগ, জারুলের বেগুনি মুগ্ধতা, চম্পার স্নিগ্ধ সুবাস, করবীর কোমল সৌন্দর্য, জবা, টগর আর ভৃঙ্গরাজের অপার সমারোহ যেন প্রকৃতির নিজস্ব ভাষায় স্বাগত জানাচ্ছিল নতুন এক অধ্যায়ের সূচনাকে।
পাখির কলতান, বাতাসের মৃদু পরশ আর ফুলের সুবাসে মুখরিত হয়ে উঠেছিল পুরো বিদ্যাপীঠ।
মনে হচ্ছিল, এ যেন কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের দিন নয় বরং একটি পরিবারের বহুদিনের অপেক্ষার অবসান, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের এক মহোৎসব। পবিপ্রবি'র প্রতিটি ইট, প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি পথ আর প্রতিটি হৃদয় যেন একসঙ্গে উচ্চারণ করছিল আজ শুরু হচ্ছে নতুন প্রত্যাশার, নতুন স্বপ্নের এবং নতুন সম্ভাবনার এক আলোকিত যাত্রা। দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড.এস. এম.হেমায়েত জাহান যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে নিজের শহর পটুয়াখালীর ঈদগাহ সড়কস্থ গ্রীন প্যালেস থেকে ক্যাম্পাসের পথে রওনা হন, তখন হয়তো তিনিও কল্পনা করতে পারেননি তাঁকে বরণ করে নিতে অপেক্ষা করছে ভালোবাসার এমন এক অভূতপূর্ব সমুদ্র।
সকাল সাড়ে ১০টার সূর্যালোকে যখন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মামুন অর রশিদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে এসে পৌঁছান- তখন যেন আনন্দের বাঁধ ভেঙে যায়। গোলাপ,বেইলি, রজনীগন্ধ্যা,গাধা, গন্ধরাজ আর নানা বর্ণিল ফুলের সৌরভে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। প্রধান ফটক থেকে প্রশাসনিক ভবন পেরিয়ে টিএসসি পর্যন্ত দীর্ঘ পথজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিক্ষার্থীরা, তার পর শিক্ষকবৃন্দ, তারপর কর্মকর্তা এবং সর্বশেষ কর্মচারীরা সবার হাতে ছিল ফুল, সবার চোখে ছিল আনন্দের অশ্রুসিক্ত উজ্জ্বলতা, আর হৃদয়ভরা ভালোবাসা।
শত শত কোমল হাত থেকে ঝরে পড়া ফুলের পাপড়িতে যেন রচিত হচ্ছিল এক অনির্বচনীয় ভালোবাসার কাব্য। রঙবেরঙের পোশাকে সজ্জিত শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের আগমনে ফুল ছিটিয়ে জানাচ্ছিল উষ্ণ অভ্যর্থনা। আনসার সদস্যদের ব্যান্ডের সুর, বিএনসিসি, স্কাউট ও রোভার স্কাউট সদস্যদের গার্ড অব অনার, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি সব মিলিয়ে মুহূর্তটি যেন পরিণত হয়েছিল এক বিরল আবেগের মহোৎসবে। দেশের বিভিন্ন শীর্ষ গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও ড্রোন ও ক্যামেরা নিয়ে ছুটে এসেছিলেন ইতিহাসের সেই বিরল মুহূর্তকে ধারণ করতে এবং সাক্ষী হয়ে থাকতে।
সেদিন পবিপ্রবি'র প্রতিটি মুখে ছিল আনন্দের দীপ্তি, প্রতিটি হৃদয়ে ছিল গর্বের স্পন্দন। ভালোবাসার সেই অবারিত স্রোত যেন ভাষার সীমাকেও অতিক্রম করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে তো বটেই, দেশের উচ্চশিক্ষার অঙ্গনেও কোনো উপাচার্যকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের এমন স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগময় ও ভালোবাসায় ভরা অভ্যর্থনার নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
এরপর টিএসসি' র বিশাল সম্মেলনকক্ষে হাজারো শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উপস্থিতিতে আবেগঘন কণ্ঠে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নবনিযুক্ত ভিসি প্রফেসর ড.এস.এম. হেমায়েত জাহান। কৃতজ্ঞতা জানান সরকারের জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, নিজের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। তারপর তিনি উচ্চারণ করেন তাঁর হৃদয়ের গভীরতম স্বপ্নের কথা “এই পটুয়াখালী আমার জন্মভূমি, এই মাটির গন্ধে, নদীর বাতাসে, মানুষের ভালোবাসায় আমি বড় হয়েছি। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমার নিজের, আমার অস্তিত্বের অংশ। ২০০৩ সালে এখান থেকেই আমার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল, আর মহান আল্লাহ চাইলে হয়তো এখান থেকেই আমার কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হবে। আবেগমথিত কণ্ঠে ড.এস. এম.হেমায়েত জাহান বলছিলেন, “২০০৩ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতেই আমার কর্মজীবনের প্রথম পদচারণা। এই বিদ্যাপীঠ আমাকে দিয়েছে পরিচয়, দিয়েছে জ্ঞানচর্চার অবিরাম প্রেরণা, দিয়েছে হাজারো শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং অসংখ্য স্মৃতির অমূল্য সম্পদ। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি চাই, আমার কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়টিও যেন এই প্রিয় ক্যাম্পাসেই রচিত হয়।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, সবচেয়ে গভীর অঙ্গীকার পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা। আমি চাই, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে একটি অনুকরণীয় রোল মডেল হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বিগত দিনের প্রচলিত সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির কবর দিয়ে 'পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে আমি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলবো।আমি প্রশাসক হিসেবে নয়,সেবক হিসাবে কাজ করবো" ইনশাআল্লাহ। পটুয়াখালীর এই মাটি, এই মানুষ, এই বিশ্ববিদ্যালয় আমার আত্মার সঙ্গে মিশে আছে। তাই পবিপ্রবি'র দশম উপাচার্য হিসেবে এটিই আমার দৃঢ় প্রত্যয়-এটিই আমার অঙ্গীকার আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই বিদ্যাপীঠকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেব-যেখানে বিশ্ব তাকিয়ে দেখবে, আর গর্বভরে বলবে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান, গবেষণা ও মানবিক উৎকর্ষের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
সেদিনের সেই উচ্চারণ ছিল না কেবল একজন প্রশাসকের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি; বরং ছিল নিজের মাটির প্রতি এক সন্তানের গভীর ভালোবাসা, একজন শিক্ষকের আত্মনিবেদন এবং এক স্বপ্নদ্রষ্টার মহাকাব্যিক অঙ্গীকার। আর সেই মুহূর্ত থেকেই যেন পবিপ্রবি'র আকাশে উড়তে শুরু করেছিল নতুন প্রত্যাশার পতাকা একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার অদম্য স্বপ্নের পতাকা।হেমায়েত জাহান স্যারের সাথে আমার একটা মিল( similarity)আছে।তিনি ২০০৩ সালের শেষের দিকে অত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। আমিও একই বছর ১১ মার্চ জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করি। তিনি বিগত ১৭বছর নির্যাতিত ছিল, আমিও।পটুয়াখালী তাঁর বাসা আমার বাসার সন্নিকটে হওয়ায় আমি প্রায়ই তাঁর বাসায় আসা যাওয়া করতাম। খালাম্মা,খালু ও ভাইদের সাথে আমার ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
১৯৭৭ সালের ২৮ অক্টোবর পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন প্রফেসর ড এস. এম.হেমায়েত জাহান। প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ, গ্রামের সরল জীবনযাপন এবং পারিবারিক মূল্যবোধের স্নিগ্ধ আবহে কেটেছে তাঁর শৈশব। পিতা বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এডভোকেট মাওলানা আ. ফ.ম.শাহজাহান ছিলেন একজন প্রথিতযশা আলেম, আইনজীবী, সমাজচিন্তক ও জননেতা। উল্লেখ্য, তিনি মির্জাগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও একাধিকবার পটুয়াখালী-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। একপর্যায় তিনি বেশ সুনামের সাথে পটুয়াখালী নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর(পিপি) এর দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। ন্যায়, সততা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা তিনি পেয়েছেন বাবার কাছ থেকেই। অন্যদিকে মা বেগম লতিফা জাহান একজন আদর্শ শিক্ষিকা ছিলেন। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি নিজ কর্মজীবন ত্যাগ করেছিলেন। মায়ের স্নেহ, দোয়া,ধৈর্য এবং নীরব ত্যাগই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। আজও নামাজ শেষে মায়ের দুটি হাত তাঁর জন্য দোয়ার আকাশ হয়ে ওঠে। সেই আশীর্বাদের ছায়াতেই যেন গড়ে উঠেছে তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ় ভিত। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, নেতৃত্বগুণ এবং মানবিক মূল্যবোধ তাঁর ব্যক্তিত্বে ছোটবেলা থেকেই গভীরভাবে প্রোথিত হয়।
চার ভাই ও একটি মাত্র বোন ছিল।বড় ভাই শাহ মো: শামীম জাহান ২৫ বছর বয়সে ১৭ মে ১৯৯৭ সালে স্ট্রোক জনিত কারনে পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন এবং একমাত্র ছোট বোন সাঈদা জাহান ২৩ মার্চ ২০০৪ সালে সাত বছর বয়সে পটুয়াখালী পৌরসভার পুকুরে পরে শাহাদাৎ বরন করেন। সবার মধ্যে স্যারের অবস্থান মেঝ হওয়ায় ছোটদের প্রতি দায়িত্বশীলতা, পারিবারিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতার শিক্ষা তিনি পরিবার থেকেই অর্জন করেন। তাঁর স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর ইমিডিয়েট ছোট ভাই শাহ মো: জাফর জাহান একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকার হিসেবে কর্মজীবনে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সর্বকনিষ্ঠ ভাই শাহ মো:নঈম জাহান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন দক্ষ, চৌকস ও স্বনামধন্য কর্মকর্তা হিসেবে দেশের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। একটি মূল্যবোধসম্পন্ন ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে তিনি উপলব্ধি করেছেন জীবনের প্রকৃত সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন বা পদমর্যাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা, সমাজ ও দেশের জন্য ইতিবাচক কিছু রেখে যাওয়াই একজন মানুষের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। এই বিশ্বাসই তাঁর কর্মপ্রেরণার মূল শক্তি এবং জীবনদর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
শিক্ষাজীবনের শুরু স্থানীয় বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী শিক্ষার্থী। পিতার একটি কথা তাঁকে আজীবন পথ দেখিয়েছে “শিক্ষাই হবে তোমার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।” সেই বাণী হৃদয়ে ধারণ করেই তিনি উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যান। এন্টোমোলজি বা কীটতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, এই বিষয়টি কেবল পোকামাকড়ের আচরণ নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক বিশাল জ্ঞানভুবন। গবেষণার প্রতি অদম্য আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতনামা কিয়ংপুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তিনি বিশ্বমানের গবেষণায় নিজের স্বাক্ষর রাখেন। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত অসংখ্য গবেষণাপত্র, জিন সিকোয়েন্স সাবমিশন এবং বৈজ্ঞানিক সাময়িকীর সম্পাদকীয় বোর্ডে সম্পৃক্ততা তাঁকে একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে এতো অর্জনের পরও তাঁর মধ্যে নেই আত্মপ্রচারের কোনো প্রবণতা দেখিনি। তিনি বিশ্বাস করেন মানুষকে নিজের পরিচয় নিজেই দিতে হয় না; কর্মই মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। তাই নীরবে, নিরলসভাবে তিনি জ্ঞানচর্চা ও গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। ২০০৩ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টোমোলজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। সেই যাত্রাপথে শিক্ষক, গবেষক, বিভাগীয় প্রধান, রেজিস্ট্রার, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর এবং অবশেষে ভাইস-চ্যান্সেলরের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। প্রতিটি পদেই তিনি রেখে গেছেন দক্ষতা, সততা ও মানবিক নেতৃত্বের উজ্জ্বল স্বাক্ষর। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন; একজন অভিভাবক, একজন পথপ্রদর্শক। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানুষ গড়ার কারখানা, সভ্যতা নির্মাণের আঁতুড়ঘর। তাই তাঁর কাছে প্রশাসন মানে কেবল ফাইলের স্তূপ নয়; প্রশাসন মানে মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন, দায়িত্ববোধ এবং ন্যায়ের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার।
ব্যক্তিজীবনেও প্রফেসর ড.এস. এম.হেমায়েত জাহান একজন নিবেদিতপ্রাণ পারিবারিক মানুষ। কর্মব্যস্ত জীবনের অসংখ্য দায়িত্ব ও সাফল্যের আড়ালে তাঁর শক্তির নীরব উৎস হয়ে আছেন সহধর্মিণী নাসরিন জাহান শিমু ধর্মপ্রাণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও মূল্যবোধে উজ্জ্বল এক জীবনসঙ্গিনী। দীর্ঘ পথচলায় তাঁর নীরব সমর্থন, প্রেরণা ও ভালোবাসা যেন প্রফেসর ড. হেমায়েত জাহানের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে দিয়েছে স্থিরতা ও প্রশান্তির স্পর্শ। তাঁদের সংসারের সবচেয়ে উজ্জ্বল আনন্দের নাম দুই সন্তান পুত্র হিসান মুহতাসিম এবং কন্যা নাহিয়া হেমরিন। ব্যস্ত কর্মজীবনের অবসরে এই দুই সন্তানের হাসি, স্বপ্ন আর ছোট ছোট মুহূর্তেই তিনি খুঁজে পান জীবনের নির্মল আনন্দ। সন্তানের চোখে তিনি দেখতে পান আগামী দিনের আলোকিত বাংলাদেশের সম্ভাবনা; আর তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয় তাঁর ভালোবাসা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ ভাবনা। জ্ঞানচর্চা, দায়িত্ব ও মানবিকতার কঠোর পরিমণ্ডলের বাইরে, এই মানুষটির আরেকটি পরিচয় আছে তিনি একজন স্নেহময় স্বামী, একজন নিবেদিত পিতা এবং পরিবারের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এক মানুষ। জীবনের সব অর্জনের ভিড়ে তাঁর কাছে পরিবারের হাসিমাখা মুখগুলোই যেন সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি, আর ভালোবাসায় গড়া এই ছোট্ট পৃথিবীই তাঁর অন্তরের সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয়।
এক বৃষ্টিস্নাত সকালের স্নিগ্ধতায় পটুয়াখালীর ঈদগাহ সড়কস্থ তাঁর বাসভবন 'গ্রীনপ্যালেস'এ বসে চায়ের আড্ডায় শুরু হয়েছিল আমাদের দীর্ঘ আলাপচারিতা। বাইরে আষাঢ়ের মৃদু বৃষ্টিধারা যেমন প্রকৃতিকে সজীব করছিল, ভেতরে তেমনি কথার পরতে পরতে উন্মোচিত হচ্ছিল এক স্বপ্নবাজ মানুষের জীবন গাঁথা। এটি যেন কেবল একটি সাক্ষাৎকার ছিল না; ছিল একজন শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক, মানবিক নেতা এবং আদর্শবান মানুষের অন্তর্জগতকে জানার এক বিরল সুযোগ- তাঁর জীবন, দর্শন, সংগ্রাম পরিবার, গবেষণা, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন।এই আলাপচারিতা কেবল একজন ভাইস-চ্যান্সেলরের কর্মজীবনের গল্প নয়;এটি এক আলোকিত মানুষের জীবনদর্শন,স্বপ্ন ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা অভিজ্ঞতার আলো, দায়িত্ববোধের দৃঢ়তা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যয় যেন প্রতিটি শব্দে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শুধু একটি সাক্ষাৎকার নয়, বরং এক চলমান পাঠশালা যেখানে নেতৃত্বের প্রকৃত অর্থ, জ্ঞানের প্রতি নিবেদন এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার পাঠ মেলে। প্রফেসর ড.এস. এম.হেমায়েত জাহানের স্বপ্ন, দর্শন ও গভীর মানবিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় উপাচার্যের আসন কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি প্রজ্ঞা, দায়বদ্ধতা এবং মানবিক নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি। তাঁর জীবন ও কর্ম যেন বলে,প্রকৃত নেতৃত্ব মানুষের হৃদয় জয় করে, ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে এবং প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান স্যারের মতো সৎ, প্রজ্ঞাবান ও বহুমাত্রিক গুণে সমৃদ্ধ মানুষের উপস্থিতিই আমাদের উচ্চশিক্ষাকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে পারে। তাঁর জীবন যেন এক জ্যোতির্ময় অধ্যায় যেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারেন প্রতিটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক এবং প্রশাসক।
সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। লেখক: এম. রহমান,সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, পটুয়াখালী প্রেসক্লাব।।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স