ঢাকা , শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ , ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুবিধা নিচ্ছেন দুই প্রকৌশলী! একই পদে বেতন-ভাতা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কাজী মো. বোরহান উদ্দিন ও মো. আসাদুজ্জামান

লিটন আলী
আপলোড সময় : ২৯-০৬-২০২৬ ১২:৩৬:১৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৯-০৬-২০২৬ ১২:৩৬:১৭ অপরাহ্ন
সুবিধা নিচ্ছেন দুই প্রকৌশলী! একই পদে বেতন-ভাতা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কাজী মো. বোরহান উদ্দিন ও মো. আসাদুজ্জামান



ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাদানকারী সংস্থা হিসেবে নাগরিক সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগর ব্যবস্থাপনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসসিসির একটি নির্দিষ্ট পদে একই সময়ে দুইজন ব্যক্তি বেতন গ্রহণ করছেন, এমন অভিযোগ উঠে এসেছে, যা জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওপর নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত। এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা সবার কাম্য। সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসসিসির একটি নির্দিষ্ট প্রকৌশলীর পদে পদোন্নতি ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী একই পদের বিপরীতে কাজী মো. বোরহান উদ্দিন ও মো. আসাদুজ্জামান নামের দুইজন প্রকৌশলী কর্মকর্তা একসঙ্গে বেতন-ভাতা ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন বলে জানা যায়


ডিএসসিসির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়মিতভাবে একজন প্রকৌশলী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু একই পদের বিপরীতে আরেকজন ব্যক্তির বেতন-ভাতা নেয়ার কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে একই সময়ে কাজী মো. বোরহান উদ্দিন বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন এবং মো. আসাদুজ্জামান বেতন-ভাতা পাওয়ার ব্যবস্থা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। উক্ত পদের মাসিক বেতন, ভাতা ও সুবিধাদিও পরিমাণ মাসে আনুমানিক প্রায় দুই লাখ টাকা। এর ফলে ডিএসসিসি অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক কোটি টাকা। এর প্রভাব পড়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ সঙ্কটে, হ্রাস পায় নাগরিক সেবার মান। এতে সরকারের প্রতি জন আস্থার ক্ষয় হয়।

সিটি করপোরেশনে এমন অনিয়ম জাতীয় সুশাসনের প্রশ্ন তোলে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একই পদে দুই জনের বেতন পাওয়া কেবল অনিয়ম নয়, এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। দ্রুত তদন্ত করে এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতদের দায়ভার নির্ধারণ জরুরি।
  

জানা যায়, গত ১৭ মে ২০২০ তারিখে ফ্যাসিস্ট সরকারের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস তার প্রথম কর্ম দিবসেই ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানকে ডিএসসিসি থেকে জারীকৃত এক অফিস আদেশে চাকুরি হতে অপসারণ করেন। আসাদুজ্জামান ২০২০ সালের ২৬ জুন তারিখে আপিল আবেদন দাখিল করেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি প্রদানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কমিটির সভা আহ্বানের নোটিশ করা হয়। এই নোটিশের কথা জানতে পেরে অপসারণকৃত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে তার আপিল আবেদনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য পুনরায় আবেদন করেন।


তার আবেদন উপেক্ষা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক গত ৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখের অফিস আদেশে কাজী মো. বোরহান উদ্দিনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি প্রদান করার প্রেক্ষিতে তার যোগদানপত্র ৬ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে গৃহিত হয়। এই আদেশে স্বাক্ষর করেন প্রধান প্রকৌশলী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মো. আমিনুল ইসলাম।


স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ সিটি কর্পোরেশন-১ শাখা গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ এক নোটিশে বলা হয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান (অপসারণকৃত) এর অপসারণ আদেশ বাতিলপূর্বক চাকুরিতে পুনর্বহালের জন্য দাখিলকৃত আপিল আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্যে শুনানী ২২ জানুয়ারি ২০২৫ সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ এর অফিস কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে মর্মে নোটিশ জারী করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অপসারণকৃত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানের অপসারণ আদেশ বাতিলপূর্বক তাকে চাকুরিতে পুনর্বহালের জন্য এই সভার পূর্বে দাখিলকৃত আপিল আবেদন নিষ্পত্তি না করে তড়িগড়ি করে কাজী মো. বোরহান উদ্দিনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি প্রদানের কাজটি সম্পন্ন করা হলো কেন? কাদের স্বার্থে? এটাই প্রশ্ন থেকে যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


গত ৭ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগের এক স্মারকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (অপসারণকৃত) মো. আসাদুজ্জামানকে চাকুরি হতে অপসারণের আদেশ প্রত্যাহারপূর্বক চাকরিতে পুনর্বহালের নিদের্শনা প্রদান করা হয়। এতে বলা হয় সার্বিক বিবেচনায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন হতে জারীকৃত ১৭ মে ২০২০ তারিখের আদেশ বাতিলক্রমে মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (অপসারণকৃত)-কে চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। এছাড়া চাকরিতে পুনর্বহালপূর্বক বিধি মোতাবেক তার পাওনাদি (বেতন-ভাতাদি) পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে অনুরোধ করা হয়। এই নির্দেশনায় ১৪ জুলাই ২০২৫ তাকে পাওনাধি (বেতন-ভাতাদি) পরিশোধসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।


সে মোতাবেক তিনি ১৫ জুলাই ২০২৫ ডিএসসিসির সংস্থাপন ও প্রশাসন বিভাগ (সচিব দফতরে) বরাবর যোগদানপত্র দাখিল করেন। তার যোগদানপত্র গৃহিত হওয়ায় তাকে পদায়ন/সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে তার কর্মকালীন সময় পর্যন্ত অথবা প্রধান প্রকৌশলী যোগদান না করা পর্যন্ত উক্ত সময়ের জন্য প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন) দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ৩১ জুলাই ২০২৫ এই আদেশে স্বাক্ষর করেন ডিএসসিসির সচিব মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।

মো. আসাদুজ্জামান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গত ১৮ আগস্ট ২০২৫ চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করেন। গত ২০ আগস্ট ২০২৫ কাজী মো. বোরহান উদ্দিনকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে বদলি করা হয় এবং গত ২৭ আগস্ট ২০২৫ তাকে ডিএসসিসি হতে অবমুক্ত করা হয়।


স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪ এর ধারা ২৫ (ক) মোতাবেক স্থানীয় সরকার বিভাগের ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখের প্রজ্ঞাপনে গঠিত কমিটির গত ১১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে নগরভবনে অনুষ্ঠিত ৮ম সাধারণ সভায় আদেশ অনুযায়ী পুনর্বহালকৃত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানের বকেয়া বেতন ভাতা পরিশোধ করা এবং একটি পদে দুইজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী একজন পুনর্বহালকৃত মো. আসাদুজ্জামান ও আরেকজন পদ শূন্য না থাকা সত্বেও পদোন্নতিকৃত কাজী মো. বোরহান উদ্দিনকে বহাল রাখার সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হয়। আলোচ্য সূচিতে বলা হয়, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাংগঠনিক কাঠামো ২০১৬ এ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদ একটি। কিন্তু এই পদে দুইজনকে বহাল রাখার প্রস্তাব রাখা হয় সভায়। এর প্রেক্ষিতে আগত প্রতিনিধি বলেন, সম্পূর্ণ শূন্য পদ না হলে পদোন্নতি দেয়া যাবেনা বলে স্পষ্ট মতামত দেন।


তিনি আরো বলেন, এই পদোন্নতি বৈধ হয়নি। উক্ত সভায় আসা আরেক প্রতিনিধি বলেন, এই পদোন্নতি দেয়া সঠিক হয়নি। একই পদে দুইজন কর্মকর্তাকে বেতন ভাতা দেয়া বিধি সম্মত হয় না। আলোচনা শেষে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদটি ইতোপূর্বে শূন্য ছিল কী-না, তা যাচাই বাছাই করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে পত্র প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কাজী মো. বোরহান উদ্দিনকে পদোন্নতি প্রদানের পূর্বে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদটি শূন্য ছিল কী-না, তা নিশ্চিত না হয়ে এবং অতি উৎসাহী হয়ে পদোন্নতি প্রদান ও বেতন ভাতাদি প্রদান করার কারণেই এই জটিলতা সৃষ্টি হয়।


গত ৬ অক্টোবর ২০২৫ অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯ম সাধারণ সভায় আলোচ্যসূচিতে ডিএসসিসির সচিব মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, পদটি কখনো শূন্য ছিল না। গত ৬ জানুয়ারি ২০২৫ কাজী মো. বোরহান উদ্দিনকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। তিনি এ পদে ২৭ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে পদটি শূন্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। পদ শূন্য থাকার কারণ হলো গত ২০ আগস্ট ২০২৫ তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে বদলি করা হয় এবং ২৭ আগস্ট ২০২৫ তাকে ডিএসসিসি হতে অবমুক্ত করা হয়। সভার সংশোধিত সিদ্ধান্ত হয় যে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান এর অপসারণকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৭ মে ২০২০ সালের পর হতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদটি কখনই শূন্য ছিল না। এই সভার কার্যবিবরণীতে স্বাক্ষর করেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম।


ডিএসসিসিতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদ শূন্য না থাকা সত্ত্বে¡ও তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হতে কাজী মো. বোরহান উদ্দিনকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি প্রদান করা বিধি সম্মত হয়নি তার পদোন্নতি বৈধ হয়নি। অথচ এই পদোন্নতির কারণে এরই মধ্যে বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি বাবদ ডিএসসিসির কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে বলেও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।


পদোন্নতি দেয়ার মত পদ শূন্য ছিল না, তারপরও কেন একজনকে পদোন্নতি দিতে হলো? সিটি কর্পোরেশনের অর্থের তহবিল কী এতই বেশি যে, পদোন্নতির বাণিজ্য করতেই হবে? কোন কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রস্তাবের কার্যপত্র তৈরি করেন মূলত সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব। পদ শূন্য না থাকা সত্বেও তারা কোন বিবেচনায় একজন প্রকৌশলীকে পদোন্নতির প্রস্তাব করলেন? এরকম পদোন্নতি আরো হয়েছে কী না, তা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা বিষয়টির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাজী মো. বোরহান উদ্দিনের  অবৈধ সম্পদের হিসাব - ( আংশিক)  ৪০/ টি ,শান্তিনগর ,পীর সাহেবর গলি ,ঢাকা -১২১৭ । এই নিজ নামে এবং শালকের নামে ০৩টি ফ্ল্যাট ,হলিফ্যামিলি সংলগ্ন সুং গার্ডেনের গলিতে শেল এ্যাপার্টমেন্ট নির্মিত ভবনের ৩৫০০ বর্গফুটের  বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করেন । 

 বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী কাজী মো. বোরহান উদ্দিনের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেন নি।



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ