ঢাকা , শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ , ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বর্ণের চেয়েও এখন বেশি লাভ সিগারেট চোরাচালানে

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ১১:৫৯:৩৮ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ১১:৫৯:৩৮ পূর্বাহ্ন
স্বর্ণের চেয়েও এখন বেশি লাভ সিগারেট চোরাচালানে



এক বছর আগেও বিমানবন্দর দিয়ে আসা চোরাই পণ্যের তালিকায় সবচেয়ে বেশি ছিল স্বর্ণের বার। পাচারকারী দলের সদস্যরা যাত্রীবেশে লাগেজ, হ্যান্ডব্যাগ এমনকি শরীরের ভেতরে করেও স্বর্ণ নিয়ে আসত। গোপন সংবাদ ছাড়া নিয়মিত তল্লাশিতে কেজি কেজি স্বর্ণের চালান ধরা পড়ত চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু হাল আমলে চোরাই পণ্যে ভিন্নতা এসেছে। স্বর্ণের বারের জায়গা দখল করেছে বিদেশি সিগারেট। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে নিষিদ্ধ কসমেটিকস। তৃতীয় অবস্থানে আছে মোবাইল, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ধরনের উচ্চ শুল্কের পণ্য।

কাস্টমস গোয়েন্দারা বলছেন, ২০ টাকা পিসের এক শলাকা সিগারেটে শুল্ক পরিশোধ করতে হয় ১৭ টাকার কাছাকাছি। ১০ প্যাকেটের এক কার্টন সিগারেটে লাভ হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার টাকার বেশি। অত্যধিক লাভের বিপরীতে ঝুঁকিও কম। কারণ, স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের যেভাবে আইনের আওতায় আনা যায় সিগারেট চোরাচালানে সংশ্লিষ্টদের প্রতি সেভাবে কঠোর হওয়ার সুযোগ কম। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে তারা। এভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে প্রতি সিগারেটে প্রায় ১৭ টাকা লাভ করছে চোরাচালানিরা।


চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, হাল আমলে চোরাকারবারিরা ধরন বদলেছে। তারা এখন স্বর্ণের পরিবর্তে সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। এক বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চালালেও বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে অল্প কিছুদিন। বিশেষ করে দুবাই থেকে সরাসরি আসা ফ্লাইটগুলোয় চোরাচালানের প্রবণতা বাড়ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেদ্দা, মক্কা-মদিনা, দোহা, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি ও মাস্কাট মোট সাতটি রুটের মধ্যে পাঁচটি দিয়েই চোরাই সিগারেট আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসছে দুবাই থেকে।

বিমানবন্দর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, স্বর্ণের বার ও সিগারেট ছাড়াও মোট ১৭ ক্যাটাগরির পণ্য চোরাইপথে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসার অপতৎপরতা চালাচ্ছে চোরাকারবারিরা। এর মধ্যে মোবাইল ফোন, ই-সিগারেট, মদ ও মদ জাতীয় দ্রব্য, ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিকস গুডস, সুইট বিউটি ক্রিম, ফাস্ট এইড বক্স, সার্ভার, হুক্কা, পিসিবি, টিভি, পুটকা ও ভ্যাপ। কিছুদিন আগেও বিমানবন্দর দিয়ে আসা চোরাচালান পণ্যের শীর্ষে ছিল স্বর্ণের বার। কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি আসছে সিগারেট। স্বর্ণের বার আনার একই চক্র এখন সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। গত ছয় মাসে ইজি, মন্ড, ওরিচসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিপুল পরিমাণ সিগারেট ও নিষিদ্ধ কসমেটিকস আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ছয় হাজার ৫৪৪ কার্টন সিগারেট ও এক হাজার ৬৪৯টি নিষিদ্ধ গৌরি ক্রিম আটক করা হয়েছে। জানুয়ারি মাসে এক হাজার ৯৯৭ কার্টন সিগারেট ও ৫৮১ পিস কসমেটিকস, ফেব্রুয়ারি মাসে চার হাজার ৩৩৪ কার্টন সিগারেট ও দুই হাজার ২১৪ পিস কসমেটিকস, মার্চে এক হাজার ৪৫৬ কার্টন সিগারেট ও ৯৪০ পিস কসমেটিকস, এপ্রিলে চার হাজার ১৯১ কার্টন সিগারেট ও ৮৬১ পিস কসমেটিকস, মে মাসে পাঁচ হাজার ৮৩৪ কার্টন সিগারেট ও দুই হাজার ৭৫১ পিস কসমেটিকস আটক করা হয়েছে।

বিমানবন্দর এলাকায় কর্মরত শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিগারেট বেশি ধরা পড়ছে—এর মানে এই নয় যে, স্বর্ণের বার বা মাদক একেবারে আসছে না। এটি একটি কৌশলও হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধুলা দিতে চোরাকারবারিরা মাঝে মধ্যে প্রোডাক্ট পরিবর্তন করে। কয়েক বছর আগে স্বর্ণের বারের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের নিত্যনতুন মাদক আনা শুরু হয়েছিল। ক’দিন পর ফের স্বর্ণের বারে ফিরে গেছে। এখন সিগারেটের চালান বেশি আনা একটি কৌশল হতে পারে। কারণ বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটি গার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোযোগ এখন সিগারেটের দিকে। হয়তো এই সুযোগে স্বর্ণের বার ও মাদকের চালান ঢোকানো হচ্ছে ভিন্ন কৌশলে। আবার বর্তমানে লোকাল ও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এই কারণে ঝুঁকিও বেড়েছে। এটিও একটি কারণ হতে পারে। আর চোরাই পণ্যের চাহিদা বাড়ে ডিমান্ডের ওপর ভিত্তি করে। সিগারেট এমন একটি পণ্য যার চাহিদা লোকাল বাজারে সবচেয়ে বেশি। বাজারজাত করার প্রক্রিয়াও সহজ। আবার চোরাচালানের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। কিন্তু উচ্চ শুল্কের পণ্য হওয়ায় লাভের অংশ একেবারে কম নয়।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, কয়েকটি কৌশলে চোরাই পণ্য বের করে নিয়ে যায় চোরাকারবারিরা। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত বেশ কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড ও চিহ্নিত ঠিকাদার। মূলত বিমানবন্দরের ভেতরে বিভিন্ন দোকান ও প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ আছে তাদের। পার্কিং এলাকার দোকান এমএস-১, এমএস-২ ও শাহ আমানত স্ন্যাক্স কর্নারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এদের সঙ্গে বাইরের সিন্ডিকেট একাট্টা হয়ে চোরাই পণ্য আনা-নেওয়া করে বিমানবন্দর দিয়ে। এদের সঙ্গে ঢাকার একটি চক্রও জড়িত।



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ