জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ঝুঁকিতে প্লট-ফ্ল্যাট মালিক রাজস্ব হারিয়ে অচল হচ্ছে ।
লিটন আলী
আপলোড সময় :
০৬-০৮-২০২৬ ০৩:০৪:২০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-০৮-২০২৬ ০৩:০৪:২০ অপরাহ্ন
প্রজ্ঞাপন জারি করে প্লট বা ফ্ল্যাট হস্তান্তরে আমমোক্তারনামা বন্ধ করে দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এতে আর্থিক সংকট পড়তে যাচ্ছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) সরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থা। এ ছাড়া এই পদ্ধতি বন্ধ করায় দেশের স্বল্প আয়ের মানুষের প্লট বা ফ্ল্যাট পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্লট বা ফ্ল্যাট হস্তান্তরে আমমোক্তারনামা বন্ধ করে দেওয়ার আরও বেশকিছু সমস্যা সৃষ্টি হবে। সেগুলো হচ্ছে, গ্রাহকেরা আইনি জটিলতার পাশাপাশি দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়বে এবং অসাধু চক্র যাচাই ছাড়া সরাসরি জমি রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ পাবে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৩ জুলাই আমমোক্তারনামা বন্ধের প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়।
জাগৃকের একটি সূত্রে জানা গেছে, এই আদেশের কারণে দ্বৈত দলিল, ওয়ারিশন ফাঁকি, জাল দলিল তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। মূল ফাইল সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে না থাকায় তা যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে এই সুযোগে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের ম্যানেজ করে দলিল করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে দালালদের। আবার কিছু কিছু সাব-রেজিস্ট্রার গেজেটে নাম না থাকলেও আর্থিক সুবিধা নিয়ে দলিল করে দিচ্ছে। খুলনাতে ইতোমধ্যে এই ধরনের ৬টি দলিল সম্পাদন হয়েছে।
জানা গেছে, ইজারা দলিল করার আগে বরাদ্দপত্রের ভিত্তিতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা দলিলের মাধ্যমে প্লট, ফ্ল্যাট বা বাড়ি হস্তান্তর ও নামজারি কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এতে রাজউক, জাগৃকসহ দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দাপ্তরিক ও আর্থিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই কারণে জাগৃক কর্মকর্তা–কর্মচারীদের গত মাসের বেতন পরিশোধ করতে পারেনি।
জানা গেছে, জাগৃকের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতনের জন্য প্রতি মাসে ২৩ কোটি টাকা দরকার হয়। সরকার চাচ্ছে নিজস্ব আয় দিয়ে জাগৃক তাদের খরচ মেটাবে। সাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে বেতনের জন্য ১৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। এই টাকার পরিমাণ আরও কমানো হবে।
আর্থিক সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে জাগৃকের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমমোক্তারনামা দলিল হস্তান্তর বন্ধের কয়েকটি কারণ রয়েছে। সেখানে নানা ধরণের অনিয়ম হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব বন্ধে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আর্থিক সংকটের বিষয়টি ঢালাওভাবে বলার সুযোগ নেই। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেতন-বোনাসের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ ছাড় করাতে হয়। এ কারণে গত মাসের বেতন পাওয়া যায়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেউ কেউ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আংশিক টাকা পরিশোধ করে ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে আমমোক্তারনামা দলিল করে প্লটে বাড়ি নির্মাণ করছেন। এতে দালাল শ্রেণির লোকজন অনেক সুবিধা আদায় করে। এছাড়া জমির মালিক আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তাদেরকে (দালাল) সামান্য টাকা দিয়ে আমমোক্তারনামা দলিল তৈরি করে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করে তা অনেক চড়া দামে বিক্রি করছেন।
আমমেোক্তারনামা বন্ধে মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা
পূর্ত মন্ত্রণালয়ের ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, লিজ ডিড বা ইজারা দলিল সম্পাদনের আগেই শুধু বরাদ্দপত্রের ওপর ভিত্তি করে আমমোক্তারনামা দলিল গ্রহণের কারণে নানা জটিলতা ও আইনি বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এই জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যেই সরকার এ ধরনের দলিলের মাধ্যমে প্লট, ফ্ল্যাট বা বাড়ি হস্তান্তর বা প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের পক্ষে বলা হয়, ইজারা দলিল করার আগে শুধু বরাদ্দপত্রের ভিত্তিতে কোনো অবস্থাতেই আমমোক্তারনামা দলিল গ্রহণ করা যাবে না। আমমোক্তারনামা দলিলের কারণে পরে কোনো প্লট, ফ্ল্যাট বা বাড়ি হস্তান্তরের কার্যক্রম বা নামজারি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, গাজীপুর, সিলেটসহ দেশের সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে এই আদেশ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই প্রজ্ঞাপনে।
জাগৃকের কয়েকজন কর্মচারী বলেন, প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কারণে জনভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তাই বলে প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে না দিয়ে ওইসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা দরকার।
আবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লট বা ফ্ল্যাট চূড়ান্ত লিজ ডিড সম্পন্ন হওয়ার আগেই আমমোক্তারনামার মাধ্যমে হাতবদল হতো এবং এর বিপরীতে সংস্থাগুলো বিভিন্ন ফি ও চার্জ আদায় করতো। প্রজ্ঞাপনের কারণে এখন এই উৎস থেকে আসা রাজস্ব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
রাজউক ও জাগৃকের অধীন অনেক প্লট বা ফ্ল্যাটের প্রকৃত বরাদ্দ গ্রহীতারা দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি লিজ ডিড সম্পন্ন না করে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে প্লট বা ফ্ল্যাট হাতবদল করে আসছিলেন। এখন হঠাৎ করে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ গ্রাহকেরা আইনি জটিলতার পাশাপাশি দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়বেন।
সরকারি ভূমি-ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আমমোক্তারনামা বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষেও কথা বলছেন। তারা বলছেন, অনিয়ম ও বেনামি লেনদেন রোধে সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এর বিকল্প হিসেবে দ্রুত একটি সহজ ও স্বচ্ছ লিজ প্রদান এবং দলিল সম্পাদন প্রক্রিয়া চালু করা না হলে আবাসন খাতে মারাত্মক স্থবিরতা নেমে আসতে পারে
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্লটের ক্ষেত্রে প্রথম কিস্তি জমা দিলেই জমির দখল ও লিজ দলিল করে দেওয়া হতো। পরে লিজগ্রহীতারা পর্যায়ক্রমে কিস্তি পরিশোধ করতেন। কিস্তি পরিশোধ না হলে হেবা ও হস্তান্তর কার্যক্রম সম্পন্ন হতো না। এই আদেশের ফলে সরকারি টাকা পরিশোধ না করে লিজ দলিল মূলে হস্তান্তর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দের পর দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি চলমান থাকা অবস্থায় যেকোন গ্রহীতা কঠিন সময়ে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক, আর্থিক বিপদাপন্ন অবস্থায় তাৎক্ষণিক আমমোক্তার নিয়োগ করে অর্থ গ্রহণ করে সমস্যা সমাধানের সুযোগ পেতেন। কিন্তু ওই আদেশের ফলে বরাদ্দগ্রহীতা চরম বিপদে সম্পদ হস্তান্তর করে বিপদ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন না।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তফসিলে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই আবাসিক ফ্ল্যাট, প্লট বা বাড়ি হস্তান্তর ও রেজিস্ট্রি দলিল সম্পাদন অব্যাহত রাখার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক কর্মকর্তা। সম্প্রতি খুলনা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, গেজেটভুক্ত তফসিল ছাড়া কোনোভাবেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করা যাবে না। নিয়মবহির্ভূত এসব কার্যক্রমের কারণে সরকার ও কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দলিল মূল্যের ২ শতাংশ হারে অর্থ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুকূলে জমা দিতে হবে। খালি প্লটে দলিল মূল্যের ৩ শতাংশ হারে অর্থ আবশ্যিকভাবে জমা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, আবারও অসাধু চক্র প্রকৃত মালিকের যাচাই ছাড়া সরাসরি রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ পাবে। এতে প্রকৃত মালিকের জমি হাতছাড়াসহ সরকারি জমি জাল দলিলের মাধ্যমে বেহাত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স