ঢাকা , রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬ , ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিশোর গ্যাং: আন্ডারওয়ার্ল্ডের জ্বালানি।

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৯-০৮-২০২৬ ০১:৪৩:০৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৯-০৮-২০২৬ ০১:৪৩:০৩ অপরাহ্ন
কিশোর গ্যাং: আন্ডারওয়ার্ল্ডের জ্বালানি।


মাহফুজুর রহমান :

হাতে ঝলসে ওঠা ধারালো চাপাতি, চোখে এক অদ্ভুত নির্দ্বিধ নির্ভীকতা। বয়স ১৫ কিংবা ১৬, হয়তো তার চেয়েও কম। রাজধানীর অলিগলিতে আধিপত্যের লড়াইয়ে নামা এই কিশোরদের দেখে মনে হতে পারে, অপরাধের শুরু ও শেষ এখানেই। তবে অনুসন্ধানী চোখ বলছে ভিন্ন কথা এই কিশোররা মূল অপরাধের দৃশ্যমান মুখ মাত্র। তাদের কাঁধে বন্দুক রেখে পেছনে কলকাঠি নাড়ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অদৃশ্য জগত।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চাপাতি বা রামদা হাতে রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো এই কিশোররা মূল চালিকাশক্তি নয়, বরং তারা বড় কোনো দাবার বোর্ডের সাজানো গুটি। আর সেই বোর্ডের অদৃশ্য খেলোয়াড় হিসেবে রয়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী, কারাবন্দী অপরাধী চক্র এবং প্রভাবশালী মহলের ছায়া। ক্ষমতা, অর্থ কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তার ফাঁদে ফেলে কিশোরদের দিয়ে করানো হচ্ছে হামলা, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও ভয় প্রদর্শন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষায়, সাবেক কিশোর অপরাধীরাই এখন অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক, আর নতুন প্রজন্মের কিশোরদের তারা ব্যবহার করছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মূল জ্বালানি হিসেবে।

রাজধানীর মিরপুরের অপরাধচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানকার সিংহভাগ কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচিত  ফোর স্টার গ্রুপ। যার অন্যতম নিয়ন্ত্রক মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে থাকা মোক্তার। তার হয়ে মাঠে সক্রিয়  ভইরা দে গ্রুপ এর আশিকসহ কয়েকটি গ্যাং। একসময় কিশোর গ্যাংয়ের নেতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা এই মোক্তার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। মিরপুরের এই ঘটনা কোনো একক চিত্র নয়। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলেও কিশোর অপরাধের শিকড় বিস্তৃত হচ্ছে। 

র‌্যাব সদর দপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং চিহ্নিত করা হয়েছে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আগের তালিকার চেয়ে ১০২টি বেশি। রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে এদের আশঙ্কাজনক তৎপরতা দেখা গেছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য মতে, কেবল ঢাকাতেই সক্রিয় রয়েছে ১৫৯টি গ্যাং।


আগে এসব গ্যাংয়ের কাজ সামান্য মারামারি বা পাড়া-মহল্লায় নিজেদের উপস্থিতি জাহির করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে তারা হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি এবং ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বড় অংশ কারাগারে, আত্মগোপনে অথবা বিদেশে থাকায় তারা সরাসরি মাঠে নামতে পারে না। তাই অনুরাগী বাড়াতে ও মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তারা সহজ টার্গেট হিসেবে কিশোরদের বেছে নিচ্ছে। দ্রুত অর্থ লাভ, এলাকায় সস্তা ক্ষমতা প্রদর্শন এবং টিকটক-ফেসবুকে হিরো হওয়ার মোহকে কাজে লাগিয়ে এদের অপরাধে টানা হচ্ছে।


এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আজকের এই গ্যাং সদস্যই আগামী ৫ বছরের পেশাদার ক্যাডার। কিশোর গ্যাং এখন আর সাময়িক কোনো সামাজিক বিচ্যুতি নয়, এটি সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রধান 'রিক্রুটমেন্ট প্ল্যাটফর্ম' বা উৎস।

র‌্যাব ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, বাড্ডা, গুলশান, রামপুরা, মতিঝিল, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দাপট সবচেয়ে বেশি।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এলাকাভিত্তিক বেশ কিছু পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের সাথে এসব গ্যাংয়ের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে:

মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় সানজিদুল হক ইমন, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায়  ফোর স্টার চক্রের মোক্তার, মতিঝিলে  জিসান আহমেদ, এজিবি কলোনি ও ফকিরাপুলে ইকতিয়ার আহমেদ গোপীবাগ ও ওয়ারীতে ইদুলের অনুসারী চক্র


রামপুরায়  শাহজাদা, গুলশানও বাড্ডায় মেহেদী হাসান ওরফে কলিন্স ও মাহবুব-রবীন,গোড়ান ও খিলগাঁওয়ে সাদিকুর রহমান আকন্দ সুজন, কাইল্যা নবী, শরীফ, শিপলু ও টিপুর সমন্বয়ে গঠিত চক্রের প্রধান। 


এ ছাড়া ইমামুল হাসান হেলাল (পিচ্চি হেলাল)-সহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে নেপথ্য মদদের অভিযোগ রয়েছে।

সন্ধানের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত একাধিক ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

ইমামুল হাসান হেলাল (পিচ্চি হেলাল) দাবি করেন, কিশোর গ্যাংকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন আমার নাম জড়ানোর চক্রান্ত করছে। অন্যদিকে জিসান আহমেদ ও মেহেদী হাসান ওরফে কলিন্স পৃথকভাবে জানান, তাদের টার্গেট করে একটি নির্দিষ্ট মহল এই অপপ্রচার চালাচ্ছে; কিশোর গ্যাং পোষার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।


 সিআইডির উপমহাপরিদর্শক বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চলছে। শুধু কিশোরদের ধরে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। আমরা এদের নেপথ্যে থাকা পৃষ্ঠপোষক, অর্থের জোগানদাতা এবং অস্ত্রের উৎস ধ্বংস করতে কাজ করছি।

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের কারণেই কিশোররা এই পথে পা বাড়াচ্ছে। মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া ও বেকারত্ব, সহজলভ্য মাদক, সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও অপরাধী চক্রের ছত্রচ্ছায়া।

বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সহযোগী অধ্যাপক বলেন এটি এক দিনে তৈরি হয়নি। হটস্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষাজীবনে ফেরাতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।


এছাড়াও ডা. মেখলা সরকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন মা-বাবাকে সন্তানের গতিবিধি ও সঙ্গীদের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অহেতুক আবদার পূরণ বন্ধ করা এবং সামাজিক বন্ধন জোরদার করার মাধ্যমেই এই সংকট দূর করা সম্ভব।

কেউ অপরাধের কালিমা গায়ে মেখে পৃথিবীতে আসে না, এক বুক আশা নিয়ে সবাই একটি সুন্দর ও আলোকময় জীবনের স্বপ্ন দেখে। অথচ ভুল পথ, অসৎ সঙ্গ আর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ইন্ধনে প্রতিবেশের সম্ভাবনাময় তরুণ ও অল্পবয়সীরা আজ জড়িয়ে পড়ছে বেপরোয়া গ্যাং কালচারে।


অন্ধকার জগতের হাতছানিতে কিশোর ও যুবকদের শীর্ষ অপরাধী হয়ে ওঠার এই বিপজ্জনক প্রবণতা রোধে কেবল সামাজিক প্রতিবাদ বা আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। ভুল পথ থেকে ফেরা তরুণদের জন্য পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা এবং ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সময় এসেছে অন্যায়ের বেড়াজাল ভেঙে এই তরুণ প্রজন্মকে মূলধারায় ফিরিয়ে এনে একটি নিরাপদ ও সুন্দর সমাজ গড়ার।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ