রেলওয়ের সিপিও দপ্তর থেকে স্পর্শকাতর নথি উধাও, তথ্য লোপাটের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৯-০৮-২০২৬ ০৩:৪৭:১৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৯-০৮-২০২৬ ০৩:৪৭:১৪ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত চিফ পার্সোনাল অফিসার (সিপিও) তরুণ কান্তি বালার দপ্তর থেকে এক রেল কর্মকর্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথি রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সরকারি দপ্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী টপকে কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল উধাও হলো এবং এর পেছনে সত্য গোপন বা তথ্য লোপাটের কোনো পরিকল্পিত চেষ্টা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের (সিসিএম) দপ্তরের আদালত পরিদর্শক (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিনের একটি স্পর্শকাতর প্রশাসনিক নথি দীর্ঘদিন ধরে প্রক্রিয়াধীন ছিল। নথির নম্বর ৫৪.০১.১৫০০.১১৪.০৫.০০১.২৫। সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার খাতার দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর নথিটি চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার জন্য তৎকালীন চিফ পার্সোনাল অফিসার (সিপিও) তরুণ কান্তি বালার নিকট উপস্থাপন করা হয়। তবে দীর্ঘ প্রায় নয় মাস ধরে নথিটি সিপিওর দপ্তরে পড়ে থাকলেও এতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ বা ফাইল নিষ্পত্তি করা হয়নি। সম্প্রতি উক্ত নথিটির চূড়ান্ত স্থিতি জানতে গিয়ে দেখা যায়, সেটি সিপিও কক্ষে নেই এবং দপ্তরের সংশ্লিষ্ট অন্য কোথাও এর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। উপরন্তু, নথিটি দপ্তরের বাইরে অন্য কোথাও পাঠানো বা হস্তান্তরের কোনো এন্ট্রি রেজিস্টার খাতায় উল্লেখ নেই।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম সিআরবিতে কর্মরত রেলওয়ের কর্মী মাকসুদা আক্তার লিখি এবং তার স্বামী মাহবুবুর রহমান ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে জিনিয়া নাসরিনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে দাবি করা হয়, জিনিয়া নাসরিন সরকারি চাকরির পাশাপাশি আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে দ্বৈত পেশা সংক্রান্ত সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করছেন। ওই অভিযোগের পর জিনিয়া নাসরিন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি থেকে দুটি পৃথক দাপ্তরিক প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে রেলওয়ে প্রশাসনের নিকট জমা দেন। প্রত্যয়নপত্রে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, জিনিয়া নাসরিন কখনোই সেখানে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগের বিপরীতে প্রয়োজনীয় যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র প্রশাসনের কাছে দাখিল করেন।
এর প্রেক্ষিতে রেলওয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন ওয়েলফেয়ার ইন্সপেক্টরকে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে সরেজমিনে পাঠিয়ে অভিযোগের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হয়। পরবর্তীতে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সুবক্তগীনের নির্দেশে পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত আইনি পর্যালোচনার জন্য একজন ব্যারিস্টারের নিকট পাঠানো হয়। আইনগত মতামত প্রদানকালে উক্ত ব্যারিস্টার লিখিতভাবে স্পষ্ট জানান, জিনিয়া নাসরিন দ্বৈত পেশায় যুক্ত থাকার মতো কোনো অপরাধ করেননি এবং এক্ষেত্রে সরকারি চাকরি বিধিমালার কোনো লঙ্ঘন ঘটেনি। ওই আইনি মতামতের সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদ ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর সিপিও (পূর্ব) ও জিএম (পূর্ব)-এর উদ্দেশ্যে একটি দাপ্তরিক পত্র প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে জিএম (পূর্ব) ও সিপিও (পূর্ব) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলে সিপিওর জেনারেল শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট নথিটি উপস্থাপন করা হয়েছিল।
রেজিস্টার খাতার এন্ট্রি নিশ্চিত করা সত্ত্বেও টানা নয় মাস নথিতে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া এবং পরবর্তীতে তা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা। বিগত কয়েকদিন ধরে জিনিয়া নাসরিন নথিটির অবস্থান জানতে সিপিও দপ্তরে গিয়ে সিপিও তরুণ কান্তি বালার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি ফাইলটির বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে আদালত পরিদর্শক (গ্রেড-১) জিনিয়া নাসরিন জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির প্রত্যয়নপত্র, রেলওয়ে প্রশাসনের নিজস্ব সরেজমিন যাচাই-বাছাই এবং ব্যারিস্টারের আইনগত মতামত, প্রতিটি পর্যালোচনায় তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সত্য তথ্য ও নিরপেক্ষ তদন্তের ফল প্রকাশ পাওয়ার পরই পুরো নথিটি গায়েব করে দেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সঠিক তথ্য গোপন করা। তবে নথিটির প্রতিটি দাপ্তরিক তথ্যের কপি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে তা প্রশাসনের নিকট উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে দাপ্তরিক নথি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত চিফ পার্সোনাল অফিসার (সিপিও) তরুণ কান্তি বালা জানান, নথিটি বর্তমানে তার কাছে বা তার দপ্তরে নেই। রেজিস্টার খাতার এন্ট্রি প্রসঙ্গের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের ফাইল চুরির ঘটনা পূর্বেও ঘটেছে। তার রুম থেকে ফাইল চুরি হলে ২৪ ঘণ্টা ফাইল পাহারা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। যে ফাইলটি নিয়েছে সে চোর এবং তাকে ধরতে পারলে জেল খাটতে হবে। তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেবেন এবং ফাইল পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি নোটিশ পাঠাবেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স