মেগা প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার খেলা, কমিশনকে পাশ কাটিয়ে দায়মুক্তি!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১১-০৮-২০২৬ ০১:৫৪:২৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-০৮-২০২৬ ০১:৫৪:২৯ অপরাহ্ন
শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে দায়মুক্তি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে চলতি বছর ১১ মার্চ পৃথক দুটি মামলা থেকে তাদের দায়মুক্তি দেয়া হয়। সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক, পরিচালক এবং উপপরিচালকের গোপন সমঝোতা এবং একটি ‘প্যাকেজ ডিল’-এর আওতায় এ দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে মর্মে জানা গেছে। পৃথক দুটি মামলা তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও দুই আসামির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের মামলা নেইÑ মর্মে অনাপত্তি (এনওসি) দেয়া হয় কমিশনকে পাশ কাটিয়ে, অভিনব এক কৌশলে। আইনজ্ঞদের মতে, এটি শুধু সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহারই নয়, মিথ্যা তথ্য প্রদান, পরপস্পর যোগসাজশ, প্রতারণা এবং ঘুষ লেনদেনেরও প্রমাণক।
আর এমন সব হাইপ্রোফাইল মামলায় দুই প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা হয়েছে, যে মামলার আসামিদের কেউ কেউ আইনের চোখে এখন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর কোনো আসামি গ্রেফতার হয়ে রয়েছেন কারাগারে। প্রতিবেদকের নিজস্ব অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা ভয়াবহ এ ঘটনায় আইনজ্ঞরা শুধু বিস্ময়ই প্রকাশ করেননি, হয়েছেন হতবাক। এ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি বছর ১১ মার্চ সিএএবি, সিভিল সার্কেল প্রকল্প নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আমিনুল হাসিবকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। অভিন্ন চিঠিতে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মইদুর রহমান মো. মওদুদকেও। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বরাবর লেখা দুদক পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘এ কার্যালয়ের (দুদক)ও প্রাপ্ত তথ্য মতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নি¤œ বর্ণিত মোট ২ (দুই) জন কর্মচারির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে কোনো মামলা তদন্তাধীন/বিচারাধীন নেই।’ কর্মকর্তারা হলেন, (১) মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল), সিভিল সার্কেল প্রকল্প, সিএএবি। (২) মইদুর রহমান মো. মওদুদ, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল), ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, সিএএবি। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-৩০.০০.০০০০.০০০.০১৩.১২.০০০১.১৭-৩০৫, তারিখ : ১৮-১১-২০২৫-এর প্রেক্ষিতে উপরোক্ত চিঠি দেয় দুদক। অথচ রেকর্ডপত্র বলছে ভিন্ন কথা।
গত বছর ২৭ জানুয়ারি দুদকের সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর বাদী হয়ে একটি মামলা (দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ মামলা নং-৮৪) করেন। মামলাটিতে দ-বিধির ১৮৬০ এর ১২০/১৬১/১৬৩/১৬৪/৪০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। মামলাটির ১ নম্বর আসামি ভারতে পালিয়ে যাওয়া মৃত্যুদ-প্রাপ্ত শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক। ২ নম্বর আসামি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব (সিনিয়র সচিব) মো. মুহিবুল হক, ৩ নম্বর আসামি একই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম-সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার। এ মামলায় মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে দায়মুক্তি দেয়া নির্বাহী প্রকৌশলী মইদুর রহমান মওদুদ ৯ নম্বর আসামি। অন্য আসামিরা হলেনÑ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তৎকালীন চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল (অব.) এম. মফিদুর রহমান, সিভিল এভিয়েশনের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মালেক, বেবিচকের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলী) মো. হাবিবুর রহমান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লি:’-এর মালিক মাহবুবুল আনাম, একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক লুৎফুল মাজেদ, সিভিল এভিয়েশনের তৎকালীন উপসচিব শাহ জুলফিকার হায়দার এবং সিভিল এভিয়েশনের তৎকালীন উপসচিব (পরবর্তীতে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. আনিছুর রহমান।
এজাহারটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের নামে ২১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এফআইআরে বলা হয়Ñ দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান কার্যালয়, ঢাকার নথি নং-০০.০১.০০০০.৫০২.০১.০৫৬.২৪ মূলে অভিযোগ অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটের সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত মেগা প্রকল্পের কাজে স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে বেআইনিভাবে সুবিধা নিয়ে ও দিয়ে ‘অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ বেআইনিভাবে কো-কন্ট্রাক্টর হয়ে কার্যাদেশ প্রাপ্তি ও তা বাস্তবায়নে নিয়োজিত হয়। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও চুক্তি লঙ্ঘন করে পরস্পর যোগসাজশে প্রকল্পের কাজে ‘অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লি:’ যুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম ও পরিচালক আসামি লুৎফুল্লাহ মাজেদ।
অনুসন্ধানকালে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা আসামি তারিক আহমেদ সিদ্দিকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তারা প্রকল্পটির কাজ পিপিআরের বিধান লঙ্ঘন করে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আসামি মো. মুহিবুল হক, সাবেক যুগ্ম-সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, আসামি এম. মফিদুর রহমান, আব্দুল মালেক, মো. হাবিবুর রহমানসহ গণকর্মচারীগণকে অবৈধভাবে প্রভাবিত করে পরস্পর যোগসাজশে প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নেন। ঠিকাদার ‘অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লি:’ ১৭টি দেশের লোকাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। একটি চায়না কোম্পানির লোকাল এজেন্ট হিসেবে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার নতুন টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজে ২১২ কোটি টাকার অগ্রিম বিল গ্রহণপূর্বক কাজ বন্ধ করে এ অর্থ আত্মসাৎ করেন।
৯ নম্বর আসামি মইদুর রহমান মো. মওদুদের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, তিনি, শাহ জুলফিকার হায়দার এবং মো. আনিছুর রহমান পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ করে আর্থিক ও প্রশাসনিক এখতিয়ার লঙ্ঘনপূর্বক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যয় মঞ্জুরি, পরিদর্শন, অর্থ ছাড়করণ-সংক্রান্ত বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান বাদী হয়ে দায়েরকৃত আরেক এজাহারে (দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়,ঢাকা-১ এর মামলা নম্বর-৮৫) তারেক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে ১৫০ কোটি আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এই এজাহারে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব ৯ নম্বর আসামি। তার বিরুদ্ধে কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক পেসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন নির্মাণে পরস্পর যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এজাহারভুক্ত অন্য আসামিরা হলেনÑ তারিক আহমেদ সিদ্দিক, মো. মুহিবুল হক, জনেন্দ্রনাথ সরকার, এম. মফিদুর রহমান, মো. আব্দুল মালেক, প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান, অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লি:’-এর মালিক মাহবুবুল আনাম, পরিচালক লুৎফুল্লাহ মাজেদ, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম, মো. শফিকুল ইসলাম এবং তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউনূস ভূঁইয়া। দুটি মামলাই এখন তদন্তাধীন। মহাপরিচালক মো. মোকাম্মেল হক নেতৃত্বাধীন মানিলন্ডারিং শাখার কর্মকর্তারা মামলা দুটি তদন্ত করছেন
দুদক সূত্র জানায়, ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করে চলতি বছর ৩ মার্চ। তারা বিদায় নেয়ার পরপর ১১ মার্চ দেয়া এনওসির মাধ্যমে দেয়া হয় এ দায়মুক্তি। এ ধরনের এনওসি প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হলেও প্রয়োজন হয় না কমিশনের অনুমোদন। দুদক সচিবের দফতর নিজস্ব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচাই-বাছাই শেষে দেয়া হয় এই এনওসি (নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট)।
এদিকে মামলা তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও ‘কোনো মামলা নেই’ মর্মে এনওসি প্রদান দুদকের নিজস্ব আইনেই গুরুতর অপরাধ-মর্মে মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মো. মঈদুল ইসলাম। তার মতে, এখানে অনেকগুলো অপরাধ সংঘটনের আলামত স্পষ্ট। প্রথমত, মিথ্যা এনওসি প্রদানের মাধ্যমে প্রকারান্তে আসামিদের দায়মুক্তি প্রদান। আসামিকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া। শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দেয়া। সরকারকে মিথ্যা তথ্য প্রদান। পরস্পর যোগসাজশ। ঘুষ লেনদেন। সবগুলো অপরাধই এ ক্ষেত্রে সংঘটিত হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান। সে ক্ষেত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে দুদক আইনে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা যেতে পারে মর্মেও অভিমত দেন অবসরপ্রাপ্ত এই সিনিয়র জেলা জজ
ফৌজদারি আইনে অভিজ্ঞ ঢাকা বারের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. মাহবুবুর রহমান বলছেন, দুদক যেসব অপরাধের তদন্ত করে থাকেÑ এর মধ্য দিয়ে এ ক্ষেত্রে একই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুতর। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স