সংকটে অকেজো প্রায় গোসাইরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৭-০৮-২০২৬ ০৪:২৭:২৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৭-০৮-২০২৬ ০৪:২৭:২৩ অপরাহ্ন
শরীয়তপুর জেলার অন্যতম একটি উপজেলা গোসাইরহাট। যার জেলা শহর থেকে দূরত্ব অন্যান্য উপজেলার চাইতে অনেক বেশি। তবে এই উপজেলার থেকে বেশি নাজুক অবস্থা এখানকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়া হাসপাতালটিতে ২২ জন চিকিৎসকের বিপরীতে রয়েছে মাত্র ১১ জন। যার মধ্যে নেই গুরুত্বপূর্ণ সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক। ফলে চালুর পর থেকেই বন্ধ আছে গুরুত্বপূর্ণ সব অপারেশন। আর এই সুযোগটি নিয়ে রোগীদের গলা কাটছে আশপাশে গড়ে ওঠা নামে-বেনামের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিকগুলো।
স্থানীয় ও সরেজমিনে জানা যায়, ১৯৫৮ সালে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু হয় গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির। ১৯৮৩ সালে এটিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়। সবশেষ ২০১৮ সালে এটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। একটি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের অন্তত দুই লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসা সেবার ভরসা এই ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, চিকিৎসক ঘাটতি, নষ্ট যন্ত্রপাতি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এখান থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, হাসপাতালটিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ২২টি পদ রয়েছে। এরমধ্যে শুধু চিকিৎসক রয়েছেন ১১ জন। এছাড়া বাকি ১১টি পদ শূন্য। গুরুত্বপূর্ণ জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি), জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি), জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেশিয়া) চিকিৎসকের পদগুলো সম্পূর্ণ শূন্য পড়ে আছে। ফলে বন্ধ আছে সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন। এছাড়াও হাসপাতালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) পদটিও শূন্য।
অপরদিকে দুইজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে রয়েছে একজন, ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসারের ৪টি পদের বিপরীতে রয়েছে ২টি। এছাড়াও সহকারী সার্জন ৭টি পদের বিপরীতে রয়েছে মাত্র দুই জন। অর্থাৎ এখানে পাঁচটি পদই ফাঁকা।
.
রয়েছে জনবল সংকটও। সিনিয়র স্টাফ নার্স, মেডিকেল টেকনিশিয়ান (ল্যাব), উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ (রেজিওলজি ও ইমাজিং) মোট ৩৭টি পদ সম্পূর্ণ ফাঁকা রয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক সংকটের এমন ভঙ্গুর দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন ও রোগীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, অপারেশন না হওয়ায় ওটি কক্ষটি বন্ধ রয়েছে। একজন কর্মচারীর মাধ্যমে কক্ষটির তালা খোলা হলে ভেতরে দেখা যায় দীর্ঘদিন ধরে অপারেশন ব্যবস্থা চালু না থাকায় যন্ত্রপাতিগুলো প্রায় অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়াও প্রায় নষ্ট হওয়ার পথে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, এক্স-রে মেশিন, ইসিজি মেশিন, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, মাইক্রোপিপেট, মাইক্রোস্কোপ মেশিনসহ গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ মেশিন। যদিও এসব যন্ত্রপাতি দেওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কুচাইপট্টি এলাকার ষাটোর্ধ্ব নজরুল ঢালী সম্প্রতি নারিকেল গাছ থেকে পড়ে গিয়ে একটি পা ভেঙে গেছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল না হওয়ায় প্রথমেই শরণাপন্ন হন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। পরবর্তীতে জানতে পারেন এখানে পা ভাঙার অপারেশন হয় না। পরবর্তীতে তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মোটা অংকের টাকা খরচ করে অপারেশনটি সম্পন্ন করেন। উপজেলা হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ এমন চিকিৎসা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা চরের মানুষ। কামলা দিয়া খাই। পড়শীর নারিকেল পাড়তে উঠে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙে যায়। পোলারে নিয়া হাসপাতালে আইছিলাম চিকিৎসা করাতে। পোলায় খোঁজ নিয়া কইলো এইখানে অপারেশনের ডাক্তার নাই। পরে একটা ক্লিনিক থেকে বেশি টাকা দিয়া অপারেশন করাইছি। আমরা গরিব মানুষ, চাইলেও দূরে যাইতে পারি না। যদি আমাদের এই হাসপাতালে সব ধরনের ডাক্তার থাকতো আমরা চরের মানুষজন ভালোভাবে চিকিৎসা নিতে পারতাম।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈকত টেপার ক্ষোভও হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকা নিয়ে। তিনি বলেন, আমাদের গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনেক রোগের চিকিৎসক নেই। বিশেষ করে গাইনি চিকিৎসক না থাকায় গর্ভবতী মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে গেছে। কয়েকদিন আগেও হাসপাতালে সিজার না হওয়ায় বাইরের একটি ক্লিনিক থেকে সিজারের সময় বাচ্চাটা মারা গেছে। মায়ের অবস্থা খারাপ হওয়ায় সদর হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। আমাদের এই উপজেলা থেকে জেলা শহরের দূরত্ব অন্যান্য উপজেলার চাইতে বেশি। তাই চাইলেই সব সময় রোগী শহরে নেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা চাই এই উপজেলাটিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা সেবা চালু করা হোক।
সেফালী বেগম নামের এক রোগী বলেন, আমার বাচ্চাকে কুকুরের কামড় দিয়েছে, তাই এখানে নিয়ে এসেছি। এসে জানতে পারি এখানে কোনো কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিন নেই। তারা আমাকে সদরে নিয়ে যেতে বললো। সদরে যেতে আমাকে বেশি টাকা খরচ করতে হবে। আমরা চাই এখানে কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা হোক।
এ ব্যাপারে গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাফিজুর রহমান মিঞা বলেন, আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। হাসপাতালে অন্যান্য স্টাফের পদ শূন্য থাকায় এখানে চিকিৎসাসেবায় ব্যাঘাতও ঘটছে। গাইনি চিকিৎসক, সার্জারি চিকিৎসক ও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিনও এখানে সরবরাহ করা হয় না। আমরা চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। আমি মনে করি খুব দ্রুত এই শূন্য পদগুলো পূরণ করা খুবই জরুরি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স