ঢাকা , শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ , ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঠাকুরগাঁওয়ের জয়ন্ত সেন অভাবের ঘরে স্বপ্নের আলো জ্বাললেন

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২২-০৮-২০২৬ ০২:৩২:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২২-০৮-২০২৬ ০২:৩২:১৫ অপরাহ্ন
ঠাকুরগাঁওয়ের জয়ন্ত সেন অভাবের ঘরে স্বপ্নের আলো জ্বাললেন
রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ একসময় দিন শেষে জয়ন্ত সেনের হাতে ল শুধু শূন্যতা। কাজ ছিল না, নিয়মিত আয়ও ছিল না। সংসারের অভাব একদিকে, নিজের বেকারত্ব অন্যদিকে। দুইয়ের চাপে ভবিষ্যৎ যেন ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরিতেই কেটে যেত দিনের বড় একটা সময়। অথচ মনের ভেতর একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরত, এভাবে আর কত দিন? পড়াশোনার পথও তার বেশি দূর এগোয়নি। অভাবের সংসারে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পরই থেমে যায় পড়াশোনা। যে বয়সে অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, সে বয়সেই জয়ন্তকে ভাবতে হয়েছে সংসার আর নিজের জীবিকা নিয়ে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের জামুরীপাড়া এলাকার বিশ্বেসর সেনের ছেলে জয়ন্ত সেনের বয়স এখন ২৫ বছর। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজো। ছোটবেলা থেকেই অভাবকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্নও একসময় তার কাছে বিলাসিতার মতো মনে হয়েছে। মাধ্যমিকের পর কাজের সন্ধানে ঘুরেছেন জয়ন্ত। কিন্তু কাজ মেলেনি নিয়মিত। ফলে কখনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কখনো উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি এভাবেই পার হচ্ছিল সময়। তবে থেমে ছিল না তার ভেতরের ইচ্ছেটা। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা ছিল। প্রয়োজন ছিল শুধু এমন একটি সুযোগ, যেখান থেকে শুরু করা যায়। সেই সুযোগ একদিন সত্যিই আসে। ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)'র রেইজ প্রকল্পের কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রমের একটি লিফলেট হাতে পান জয়ন্ত। সেখানে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগের কথা জানতে পারেন তিনি। লিফলেটের তথ্য পড়ে কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। জয়ন্ত যোগাযোগ করেন ইএসডিও কার্যালয়ে। প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করেন। নির্বাচিত হওয়ার পর ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)'র রেইজ প্রকল্পের সহযোগিতায় মাস্টার ক্রাফটপার্সন মো. সাদেকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণের দিনগুলো যেন জয়ন্তের কাছে শুধু কাজ শেখার দিন ছিল না, ছিল নিজের জীবনটাকে নতুন করে ভাবার সময়ও। তিনি শেখেন ইলেকট্রনিক বিভিন্ন যন্ত্রের ত্রুটি শনাক্ত করা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং। যন্ত্রের ত্রুটি খুঁজে বের করার পাশাপাশি ধীরে ধীরে নিজের জীবনের অচলাবস্থার কারণও যেন খুঁজে পাচ্ছিলেন তিনি। কাজ শেখার সঙ্গে বাড়তে থাকে আত্মবিশ্বাস। তখনই সিদ্ধান্ত নেন অন্যের কাজের অপেক্ষায় বসে থাকবেন না, নিজের কাজ নিজেই তৈরি করবেন। প্রশিক্ষণ শেষে ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)'র রেইজ প্রকল্প থেকে পাওয়া ২১ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তির অর্থ তার হাতে আসে। অল্প এই অর্থই হয়ে ওঠে জয়ন্তের বড় স্বপ্নের প্রথম পুঁজি। সেই টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় একটি মেশিন কেনেন তিনি। এরপর ঠাকুরগাঁও শহরের বদিউলের মোড়ের ঘোষপাড়া এলাকায় ছোট পরিসরে শুরু করেন নিজের ব্যবসা ‘এ আর কে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার’। নতুন দোকান, সীমিত পুঁজি, অল্প পরিচিতি- সব মিলিয়ে প্রথম দিকে গ্রাহকও ছিল কম। দোকানে বসে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু জয়ন্ত অপেক্ষার সময়টাকে হতাশায় নষ্ট করেননি। কাজের প্রতি আন্তরিকতা, শেখা দক্ষতা আর গ্রাহকদের ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ধীরে ধীরে মানুষ তাকে চিনতে শুরু করে। এক গ্রাহক থেকে আরেক গ্রাহক এভাবেই বাড়তে থাকে পরিচিতি। যে হাতে একসময় কাজ ছিল না, সেই হাতই এখন অন্যের নষ্ট হয়ে যাওয়া ইলেকট্রনিক যন্ত্র ঠিক করে দেয়। বর্তমানে নিজের দোকান থেকে মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন জয়ন্ত। নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজনেও সহায়তা করছেন। তবে এখানেই থামতে চান না তিনি। ভবিষ্যতে দোকানটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন। জয়ন্ত সেন বলেন, ‘একসময় আমার কোনো কাজ ছিল না। কী করব, কীভাবে নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু করব, এসব নিয়ে সব সময় চিন্তা হতো। কাজ না থাকায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, ঘোরাঘুরি করেই অনেকটা সময় কেটে যেত। একদিন ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)'র কমিউনিটি আউটরিচ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের সুযোগের কথা জানতে পারি। তখন মনে হলো, সুযোগটা কাজে লাগানো উচিত। কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে মানুষ আমার কাজ সম্পর্কে জানতে শুরু করে, পরিচিতি বাড়ে এবং এখন আলহামদুলিল্লাহ, মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করতে পারছি। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, এখন আর নিজেকে বেকার মনে হয় না। নিজের একটা পরিচয় তৈরি হয়েছে। নিজের হাতে কাজ আছে, আয় আছে, এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আমার ইচ্ছা ভবিষ্যতে যেন আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি, সেই স্বপ্নও আছে। ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর ট্রেনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সাপোর্ট অফিসার মো. সাজেদুর রহমান বলেন, জয়ন্তের মতো অনেক তরুণের মধ্যেই কাজ করার আগ্রহ ও সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাব, সঠিক দিকনির্দেশনার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকায় অনেকেই সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেন না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়াই নয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন তরুণকে বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা এবং তার জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। তিনি আরও বলেন, জয়ন্ত প্রশিক্ষণের সুযোগটি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি একটি নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেই একটি ব্যবসা শুরু করেছেন। আমরা তাকে যে সহায়তা দিয়েছি, সেটিকে তিনি নিজের পরিশ্রম ও উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন বলেই আজ একটি টেকসই আয়ের পথ তৈরি করতে পেরেছেন। তার মতো আরও তরুণ যেন দক্ষতা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, সে লক্ষ্যেই ইএসডিও রেইজ প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও ০১৭৪০৮৬১০৮০

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ