চাকরি সরকারি, ব্যবসা জমজমাট—গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলী ‘মিনি শিল্পপতি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৯-০৮-২০২৬ ১২:১৯:৫০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৯-০৮-২০২৬ ১২:১৯:৫০ অপরাহ্ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও অবৈধ ডেভেলপার ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে তাঁরা বড় বড় ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
আমাদের অনুসন্ধানে এই পাঁচ প্রকৌশলীর কথিত ডেভেলপার ব্যবসার বিভিন্ন তথ্য ও নথি উঠে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান মিজান। তাঁর সঙ্গে উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু, সহকারী প্রকৌশলী ই/এম আবুল বাসার, উপসহকারী প্রকৌশলী ই/এম আব্দুর রউফ এবং সহকারী প্রকৌশলী ই/এম গুলনাহারসহ তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের দুই ভাই ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সে হেড অব মার্কেটিং পদে রয়েছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ সাল থেকে তাঁদের এই ডেভেলপার ব্যবসার কার্যক্রম শুরু হয়। এদের একটি বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত কিছু ভিডিও ফুটেজ ও নথি আমাদের হাতে এসেছে।
ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের একাধিক কার্যালয়
অনুসন্ধানে ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের একাধিক কার্যালয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—মোহাম্মদপুরের বসিলা ব্রিজসংলগ্ন ওয়াশপুর টাওয়ার, মিরপুর-১-এর গৈদারটেক, উত্তরা দক্ষিণ মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন দিয়াবাড়ি এবং সাভার ডিওএইচএস-নবীনগর এলাকা।
ওয়াশপুর টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির একটি কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে—অফিস-২, ১৮/৪, নিচতলা, ওয়াশপুর টাওয়ার, ওয়াশপুর, মোহাম্মদপুর-বসিলা ব্রিজসংলগ্ন, ঢাকা।
এ ছাড়া মিরপুর-১-এর গৈলারটেক এলাকায় অফিস-১, নিচতলা, ওয়ার্ড-১০-এর ঠিকানাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার মো. রাশেদ-উল আলমের নাম পাওয়া যায়।
ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স নিজেদের ডিজাইন, কনস্ট্রাকশন ও ইন্টেরিয়র সলিউশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের সেবার মধ্যে রয়েছে—বিল্ডিং ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন, স্ট্রাকচারাল ও আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, ইলেকট্রিক্যাল ও প্লাম্বিং ডিজাইন, রাজউক প্ল্যান পাস, মাটি পরীক্ষা, হোম ইন্টেরিয়র এবং অফিস ইন্টেরিয়র।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ও ঠিকানার মূলকেন্দ্র হিসেবে মোহাম্মদপুরের বসিলা ও ওয়াশপুর এলাকার তথ্য পাওয়া যায়।
কেরানীগঞ্জের ওয়াশপুর এলাকায় ফিউচার ড্রিমের নির্মিত ভবন
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বসিলা ও ওয়াশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির নামে ভবন নির্মাণ এবং ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির কার্যক্রম রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আইন কী বলে
সরকারি চাকরি আইন ও সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীরা সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া লাভজনক কোনো ব্যবসা, বাণিজ্য বা অন্য কোনো পেশায় সরাসরি যুক্ত হতে পারেন না।
কোনো সরকারি কর্মচারী অনুমতি ছাড়া বা গোপনে ব্যবসা পরিচালনা করলে তা সরকারি চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয় হতে পারে এবং বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আইনি নিষেধাজ্ঞা ও স্বার্থের সংঘাত
বাণিজ্যিক ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা: সরকারি কর্মচারীরা সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া লাভজনক ব্যবসা বা বাণিজ্যে সরাসরি অংশ নিতে পারেন না।
কোম্পানি পরিচালনায় বিধিনিষেধ: সরকারি চাকরির আচরণবিধি অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারীর কোম্পানি প্রতিষ্ঠা বা তার ব্যবস্থাপনায় সরাসরি যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিধিনিষেধের আওতায় পড়ে।
স্বার্থের সংঘাত: গণপূর্তের প্রকৌশলীরা নির্মাণ ও উন্নয়নকাজের তদারকি, প্রাক্কলন তৈরি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। একই সঙ্গে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ডেভেলপার ব্যবসায় যুক্ত থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে।
ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের একটি প্রসপেক্টাস
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে লঘুদণ্ড থেকে গুরুদণ্ড পর্যন্ত ব্যবস্থা হতে পারে।
এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন বা দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইন অনুযায়ীও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তৎপরতা
অভিযুক্ত গণপূর্ত প্রকৌশলীদের কথিত ডেভেলপার ব্যবসা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা বদলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেড ও ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, ছবি ও ভিডিও পরবর্তীতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম-সংক্রান্ত বেশ কিছু নথি আমাদের হাতে সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কৌশল পরিবর্তন করে জমি কিনে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি মোহাম্মদপুরের বসিলা ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় ভবন নির্মাণ করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান তাঁর সহোদর ভাইদের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁর এক আত্মীয়ের সঙ্গেও ডেভেলপার ব্যবসায় যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উত্তরায় এফডিবিএলের নির্মাণাধীন সাইট দেখাশোনা করছেন মিজানের ভাই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ
ডালাস ডেভেলপারসের সঙ্গেও পার্টনারশিপের অভিযোগ
ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেডের সঙ্গে উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল বাসারের অদৃশ্য পার্টনারশিপ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর প্রমাণ হিসেবে সাভার ডিওএইচএস এলাকার কিছু তথ্য ও নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আবুল বাসার তাঁর বক্তব্যে কিছু বিষয় স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট কিছু প্রমাণ আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকৌশলী তাঁর সহোদর ভাই ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের মাধ্যমে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আবুল বাসার গণপূর্ত ই/এম ডিভিশন-৬-এর আওতায় সাভারে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর সহধর্মিণী সহকারী প্রকৌশলী ই/এম গুলনাহারও গণপূর্তের ই/এম সার্কেল-৩-এ কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, ডেভেলপার ব্যবসার কার্যক্রমে তাঁরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।
আব্দুর রউফের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
এই কথিত ব্যবসার আরেক অংশীদার হিসেবে উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফের নামও উঠে এসেছে। তিনি মোবাইল ফোনে কোন ভবনের কোন তলার ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করা হবে, সে বিষয়ে কথা বলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ বছর ধরে গণপূর্তের সাভার ডিভিশনে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই দীর্ঘ সময়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকা-আশুলিয়া ও আব্দুল্লাহপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এলাকার ভ্যালুয়েশন কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সাভার গণপূর্তের পর্যটন এলাকার সামনে-পেছনে থাকা জমিতে দোকানপাট ভাড়া দেওয়া বা পজিশন বিক্রির ক্ষেত্রেও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
তাঁদের মতে, শুধু এই পাঁচ প্রকৌশলী নয়, সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যাতে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা অবৈধ ব্যবসায় জড়াতে না পারেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও দায়মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।
তবে এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর সবগুলো এখনো কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত প্রয়োজন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স