ঢাকা , সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬ , ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বয়স ও পদবি জালিয়াতি: ইন্তেজারের বিরুদ্ধে তদন্তের পরও নীরব প্রশাসন

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০৪:০৮:১৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০৪:০৮:১৭ অপরাহ্ন
বয়স ও পদবি জালিয়াতি: ইন্তেজারের বিরুদ্ধে তদন্তের পরও নীরব প্রশাসন


সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় বয়স জালিয়াতি এবং পরবর্তীতে প্রবীণদের কল্যাণে নিয়োজিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান 'বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (বাইগাম)’-এ মিথ্যা তথ্য দিয়ে সদস্যপদ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান মহাসচিব ইন্তেজার রহমানের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায় বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে প্রায় একমাস পূর্বে তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হলেও ‘অদৃশ্য’ কারণে এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে মুক্তিযোদ্ধা সনদের সুবিধা নিয়ে চাকরি শেষ করা এবং পরবর্তীতে সংস্থার শর্ত ভেঙে মহাসচিবের চেয়ার দখল করার এই ঘটনার সত্যতা পেয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বাইগাম কর্তৃপক্ষ।

বাইগামের গঠনতন্ত্র ও সদস্য আবেদনপত্রের বিশেষ শর্তাবলির ৫ নম্বর ক্রমিক অনুযায়ী, কোনো আবেদনকারী ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে তাঁর আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না এবং সদস্যপদ লাভের পরও এ ধরনের ত্রুটি ধরা পড়লে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তবে মহাসচিব মো. ইন্তেজার রহমানের ক্ষেত্রে এই নিয়ম তোয়াক্কাই করা হয়নি।


বাইগামের সদস্য ফরমে ইন্তেজার রহমান তাঁর জন্মতারিখ উল্লেখ করেছেন ১ মে ১৯৫৬। অন্যদিকে ১৯৭৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি যখন তিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পদে যোগ দেন, তখন সরকারি নথি অনুযায়ী তাঁর জন্মতারিখ দেখানো হয় ১ জানুয়ারি ১৯৫৫ এবং বয়স ছিল ১৮ বছর ১ মাস ২৫ দিন। এই জন্মতারিখ দেখিয়েই তিনি ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে ৬০ বছর বয়সে অবসরে যান ও সরকারি সকল ভাতা ভোগ করেন। 


কিন্তু তাঁর মূল এসএসসি সনদ অনুযায়ী জন্মতারিখ ছিল ১ মে ১৯৫৬। ১৯৭১ সালের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর, ১৯৭৩ সালে পুলিশে যোগদানের সময় তাঁর প্রকৃত বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস ২৫ দিন—যা সরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্য আইনিভাবে অযোগ্য। চাকরি বাঁচাতে তিনি প্রথমবার বয়স বৃদ্ধি করেন এবং বাইগামে এসে পুনরায় আসল সনদ ব্যবহার করে দ্বিতীয়বার অসত্য তথ্য দেন।

এ ছাড়া বাইগামের সদস্য আবেদনপত্রে তিনি নিজেকে 'সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ সরকারি পেনশন বই ও অবসরের দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী তিনি অবসরে যান 'সহকারী পুলিশ সুপার' হিসেবে।

জালিয়াতির এই সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরে অভিযোগ দায়ের করা হলে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি সরেজমিনে এবং দাপ্তরিক কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ইন্তেজার রহমানের জমা দেওয়া তথ্যের অসঙ্গতি ও জালিয়াতির পূর্ণ সত্যতা পায় এবং তদানুযায়ী প্রতিবেদন দাখিল করে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর, ঢাকা সদর কার্যালয়ের উপপরিচালক (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) মো. কামাল হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, এ ব্যাপারে একটি অভিযোগ ছিল। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও করা হয়। প্রায় মাসখানেক আগেই রিপোর্টটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তথ্য জালিয়াতি প্রমাণ হওয়ার পর ইন্তেজার রহমানের সদস্যপদ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও বাইগামের বর্তমান সভাপতি বিষয়টির সত্যতা জানার পরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

অভিযোগ রয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে মহাসচিব পদ হাতিয়ে নেওয়ার পর ইন্তেজার রহমান, কোষাধ্যক্ষ এবং কার্যনির্বাহী কমিটির একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় সংস্থায় একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন। সংস্থার একাধিক সাধারণ সদস্যের দাবি—অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তারা ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইন্তেজার রহমান তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। সময়ের কণ্ঠস্বরকে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাপারে আনা সকল অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র করছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।’ পাশাপাশি তিনি অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতির কথাও জানান।

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ শামসুল হক এ ব্যাপারে সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। প্রতিষ্ঠানটি প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিসাধনের জন্য এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

তদন্তে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ার পরও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ সদস্যদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংস্থার স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় অবিলম্বে অভিযুক্ত মহাসচিবের সদস্যপদ বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ