ঢাকা , মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদে পদে আইন ভেঙে আনোয়ার মডার্নের হাসপাতাল বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০১-০৯-২০২৬ ০১:৫৯:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০১-০৯-২০২৬ ০১:৫৯:০৮ অপরাহ্ন
পদে পদে আইন ভেঙে আনোয়ার মডার্নের হাসপাতাল বাণিজ্য


রাজধানীর ধানমন্ডির কথা শুনলেই এক অভিজাত আবাসিক এলাকার চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠে। এখানে লেক আছে। আছে সবুজে ঘেরা পার্ক। আশির দশকেই এই পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হারিয়েছে তার বৈশিষ্ট্য। তখন থেকেই এই এলাকার কিছু অংশে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়। ভবনগুলোতে চলছে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম। এর মধ্যে ধানমন্ডির ৮ নম্বর সড়কেই মডার্ন গ্রুপ অব কোম্পানিজের পাঁচটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা পদে পদে আইন লঙ্ঘন করে হাসপাতাল বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

গ্রিন রোড সংলগ্ন ধানমন্ডির ৮ নম্বর সড়কের দুই পাশে মডার্ন গ্রুপ অব কোম্পানিজের আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, আনোয়ার খান মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, আনোয়ার খান মডার্ন কার্ডিয়াক সেন্টার ও আনোয়ার খান মডার্ন কার্ডিয়াক হাসপাতাল (প্রস্তাবিত)। প্রায় ৪৫ কাঠা জমিতে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–রাজউক অবৈধ সুবিধা নিয়ে মডার্ন গ্রুপ অব কোম্পানিজকে আবাসিক এলাকায় এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে।

আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গত ৩০ ও ৩১ আগস্ট সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে মডার্ন গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান ডা. আনোয়ার হোসেন খানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

গত ২৬ ও ৩০ আগস্ট সরেজমিন দেখা গেছে, ধানমন্ডির ৮ নম্বর সড়কের পূর্বপাশে ১৭ ও ১৭/১ হোল্ডিংয়ে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল ভবন। এই ভবনের বেইসমেন্টে পার্কিংয়ের জন্য জায়গা থাকলেও সেখানে জেনারেটর রাখা হয়েছে। এছাড়া আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বেইসমেন্টে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় কয়েক শ গ্যাসের সিলিন্ডার রাখা হয়েছে। এছাড়া এখানে দুটি জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে।


আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের বেইসমেন্টের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় মালামাল রাখা হয়েছে। তবে আনোয়ার খান মডার্ন কার্ডিয়াক হাসপাতালের (প্রস্তাবিত) জায়গায় টাকার বিনিময়ে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

জানতে চাইলে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. এনায়েত হোসাইন শেখ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, রাজউকসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন নিয়েই এখানে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। কার্ডিয়াক সেন্টারের পাশে তারা বহুতল ভবন নির্মাণ করে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান করবেন। তবে ৮ নম্বর সড়কটি আবাসিক এলাকার মধ্যে পড়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজউক বিভিন্ন সময়ে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর রাজউক অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেসমিন আক্তার ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন।
অনুমোদিত নকশা দেখাতে না পারায় এবং গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় চিকিৎসকদের চেম্বার, অভ্যর্থনা কক্ষ ও ফার্মেসি স্থাপন করায় প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়। এছাড়া রাজউক একাধিকবার অভিযান চালিয়ে আবাসিক ভবনে হাসপাতালের কার্যক্রম ও নকশার ব্যত্যয় করে গাড়ি পার্কিয়ের জায়গায় গুদাম করায় আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে সতর্ক করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখন অঙ্গীকারনামা দিয়ে রক্ষা পাওয়ার পর আবারও পুরোনো চেহারায় ফিরে যায়। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি সাবেক গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের সঙ্গে আতাঁত করে। এরপর থেকে তারা হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের পূর্ব পাশেই পাঁচতলা একটি বাড়ির নিচে প্যানারোমা হসপিটাল লিমেটেড নামের একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছে। এই বাড়ির হোল্ডিং নম্বর ১৬। ভবনের দেয়ালে বিশেষজ্ঞ ডজনখানেক চিকিৎসকদের নামফলক শোভা পাচ্ছে। হাসপাতালের সামনের সড়ক দখল করে সাত–আটটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা হয়েছে।

আবাসিক এলাকায় ব্যাংক, স্কুল ও করপোরেট অফিস

রাজধানীর গ্রিন রোড সংলগ্ন ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কের মাথায় সেন্ট্রাল হাসপাতাল। এই সড়কের পুরোটাই আবাসিক। কনকর্ড টাওয়ারের বিপরীতে একটি ভবনে দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারও রয়েছে।

ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কের পাশের ভবনগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, এসব ভবনে হাসপাতালের পাশাপাশি ব্যাংক, স্কুল, করপোরেট অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে।


ধানমন্ডির ভুতের গলির স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ধানমন্ডির গ্রিন রোড ও আশপাশে পুরোটাই আবাসিক এলাকা। এই আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক করার জন্য যেসব সংস্থা অনুমোদন দিচ্ছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

নগরবিদের বক্তব্য

এ বিষয়ে বিশিষ্ট স্থপতি ও নগরবিদ ইকবাল হাবিব সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘রাজউক ঢাকা শহরের বারোটা বাজিয়েছে। পরিবেশবিদদের কঠোর আপত্তি সত্ত্বেও রাজউক রাজধানীর অনেক এলাকাকে মিশ্র বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে তারা ঢাকা শহরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট না করে একের পর এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ায় চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে।’

ইকবাল হাবিব আরও বলেন, যেকোনো স্থানে হাসপাতাল করা যায় না। আবাসিক এলাকায় হাসপাতাল গড়ে ওঠায় অনেক মানুষের সমস্যা হচ্ছে। এর সব দায়ভার রাজউকের।

গ্রিন রোড সংলগ্ন ধানমন্ডির বিভিন্ন সড়কে গড়ে ওঠেছে চিকিৎসকদের চেম্বার, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। আশির দশকের শেষে এবং নব্বই দশকের শুরুতে রাজধানীর গ্রিন রোডে চিকিৎসা সেবা শুরু হয়। শুরুতে গড়ে ওঠে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খানের সেন্ট্রাল হাসপাতাল। এরপর কমফোর্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. নজরুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ভবন নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদন রাজউক দিয়ে থাকে। সিটি করপোরেশন শুধু রাস্তাঘাট ও ফুটপাত নির্মাণ করে। এই বিষয়ে রাজউকের সঙ্গে কথা বললে পরিষ্কার হতে পারবেন।

অবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের বিষয়টি অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ফি জমা দিয়ে আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিক করার একটি সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী ধানমন্ডির ৪, ৫ ও ৭ নম্বর সড়কে নির্মিত হাসপাতালগুলো বাণিজ্যিক অনুমোদন নিয়েছিল কি না-সে বিষয়টি এই মুহূর্তে ফাইল না দেখে বলা যাচ্ছে না। তবে এই বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগ বলতে পারবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. ওবায়দুর রহমান মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়ন্টিফোরকে বলেন, ‘আবাসিক এলাকা কনভারশন ফি দিয়ে বাণিজ্যিক করার শর্ত ছিল। সে অনুযায়ী ধানমন্ডির ৪, ৫, ৭ ও ৮ নম্বর সড়কে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না–তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। সচিব আরও বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ