পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেনাকাটায় অনিয়ম, মোজার দাম ১৫০০ টাকা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০১-০৯-২০২৬ ০২:০৪:২১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-০৯-২০২৬ ০২:১২:০০ অপরাহ্ন
জুতা, স্যান্ডেল, মোজা কিংবা ছাতা - পণ্য যাই হোক, দাম প্রায় হাজার টাকা। টুপি, শাড়ি, নামফলক কিংবা ফুল শার্ট এসবের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আবার কোনো কোনো পণ্যের দাম হাজার টাকা ছাড়িয়ে এক হাজার ৫০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। গাড়ি চালক ও কর্মচারীদের জন্য পোশাক ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী কেনায় এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি চালক ও কর্মচারীদের জন্য মেসার্স রাফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কাছ থেকে ৩১ ধরনের পণ্য কিনেছে সরকারি এই সংস্থাটি। এসব পণ্যের বাজার মূল্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলেও কেনাকাটার বিলে অধিকাংশ পণ্যের একক মূল্য ধরা হয়েছে ১ হাজার টাকা করে। ফলে কিছু পণ্যের দাম বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কেনাকাটার বিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কর্মচারীদের জন্য হাফ ও ফুল সাফারি স্যুট, ফুল শার্ট, ভি-নেক সোয়েটার, জুতা, স্যান্ডেল, টুপি ও ছাতা কেনা হয়েছে। নারী কর্মচারীদের জন্য কেনা হয়েছে জর্জেট ও সুতি শাড়ি, ব্লাউজ, শাল, জুতা ও ছাতা। এ ছাড়া কর্মচারীদের জন্য নামফলকও কেনা হয়েছে।
হাজার টাকার জুতার দেড় হাজার টাকার মোজা
কেনাকাটার বিলে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে মোজার দাম নিয়ে। বাজারে ভালো ব্র্যান্ডের এক জোড়া মোজা সাধারণত ১২০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। অথচ গাড়ি চালকদের জন্য কেনা ১৪৪ জোড়া মোজার প্রতি জোড়ার দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এতে শুধু ১৪৪ জোড়া মোজার পেছনেই ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, গাড়ি চালকদের জন্য ৭২ জোড়া জুতা ও ৭২ জোড়া স্যান্ডেল কেনা হয়েছে প্রতি জোড়া ১ হাজার টাকা করে। অর্থাৎ একই কেনাকাটায় জুতার চেয়েও ৫০ শতাংশ বেশি দামে মোজা কেনা হয়েছে।
গাড়ি চালকদের জন্য ১০৮টি হাফ সাফারি প্রতিটি ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে কেনা হয়েছে। এ ছাড়া ৭২টি টুপি, ৩৬টি ছাতা ও ৩৬টি নামফলকের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার টাকা করে। দুটি ফুল সাফারি ও দুটি সোয়েটারও কেনা হয়েছে। এর প্রতিটির দাম ১ হাজার টাকা।
পুরুষ কর্মচারীদের জন্য ৬৬টি করে ফুল ও হাফ সাফারি কেনা হয়েছে। এগুরোর প্রতিটির দাম ১ হাজার টাকা করে। তাদের জন্য ১৩২ জোড়া জুতা ও ১৩২ জোড়া মোজা কেনা হয়েছে। উভয় পণ্যের প্রতি জোড়ার দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া ৬৬টি ছাতা ও ৬৬টি নামফলকের প্রতিটির দামও ১ হাজার টাকা।
নারী কর্মচারীদের জন্য ১৮টি জর্জেট ও ১৮টি সুতি শাড়ি কেনা হয়েছে। প্রতিটির দাম ১ হাজার টাকা। ১৮ জোড়া স্যান্ডেল ও ১৮ জোড়া মোজার দামও ধরা হয়েছে ১ হাজার টাকা করে। তাদের জন্য নয়টি ছাতা ও নয়টি নামফলক কেনা হয়েছে, প্রতিটির দামও ১ হাজার টাকা।
এ ছাড়া পুরুষ কর্মচারীদের জন্য ৬৬টি ভি-নেক সোয়েটার ও ৬৬টি ফুল শার্ট কেনা হয়েছে, প্রতিটির দাম ১ হাজার টাকা। নারী কর্মচারীদের জন্য নয়টি শাল বা সোয়েটার এবং নয়টি ফুলহাতা ব্লাউজ কেনা হয়েছে, প্রতিটির দামও ১ হাজার টাকা।
পুরুষ কর্মচারীদের জন্য আরও ৪০ জোড়া জুতা কেনা হয়েছে। প্রতি জোড়া জুতার দাম পড়েছে ২ হাজার টাকা দরে। একইসঙ্গে আরও ৪০ জোড় জুতা কেনা হয়েছে প্রতি জোড়া ১ হাজার ৪৭৫ টাকা করে। এ ছাড়া ২০টি ছাতা কেনা হয়েছে ১ হাজার টাকা করে।
নারী কর্মচারীদের জন্য আরও ছয় জোড়া জুতা বা স্যান্ডেল এবং ছয় জোড়া মোজা কেনা হয়েছে। উভয় পণ্যের প্রতিটি জোড়ার দাম ১ হাজার টাকা। আরও তিনটি ছাতা কেনা হয়েছে। প্রতিটি ছাতার দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার টাকা করে।
যোগসাজশে অস্বাভাবিক বিল
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ মার্চ ই-জিপি টেন্ডারের মাধ্যমে এসব পণ্য কেনা হয়। এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চুক্তি হয়। প্রতিষ্ঠানটি গণপূর্ত অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কম্পিউটার অ্যাক্সেসরিজ ও দাপ্তরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন তৎকালীন পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক, উপপরিচালক হাসান আমিন সুমন এবং সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সই করেন স্বত্বাধিকারী মো. ফখরুল আলম পাটোয়ারী, জিএম (প্রকিউরমেন্ট) মো. নূর আলম এবং জিএম (এডমিন) মোহাম্মদ আবদুল হক।
পণ্য সরবরাহের পর গত ১৩ এপ্রিল ১৭ লাখ ২০ হাজার টাকার বিল অধিদপ্তরের উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের পরিচালকের কাছে জমা দেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ফখরুল আলম পাটোয়ারী। ইতোমধ্যে বিলও পরিশোধ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে বিল তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চুক্তিপত্র ও বিলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মনিটরিং) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। বিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি কেবল স্বাক্ষর করেছি, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’
অন্যদিকে কেনাকাটার চুক্তিতে অধিদপ্তরের পক্ষে সই করা তৎকালীন উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘তিন মাস আগে আমি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে বদলি হয়ে এসেছি। বিল বা অর্থছাড় আমি করিনি।’
এ বিষয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল স্বত্বাধিকারী ফখরুল আলম পাটোয়ারীর জানান, তিনি এ বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স