রাজউক পরিচালক হামিদুলের ‘অবৈধ বিপুল সম্পদের পাহাড়’
লিটন আলী
আপলোড সময় :
০১-০৯-২০২৬ ০৩:৩৬:০৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-০৯-২০২৬ ০৩:৩৬:০৩ অপরাহ্ন
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়েরকৃত এক অভিযোগ থেকে জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫ এর পরিচালক মোঃ হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, নোটিশ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং জোন-৪ (গুলশান) এ বদলি হওয়ার জন্য জোরালো লবিং চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল করিম এই অভিযোগটি আগামীকাল দুদকে জমা দেবেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিচালক হামিদুল ইসলাম তাঁর অধীনস্থ ইমারত পরিদর্শকদের দিয়ে বাড়ির মালিকদের নোটিশ দিয়ে ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন এবং পরে সেই নোটিশ গায়েব করে দেন। এছাড়া চাকরি বাণিজ্য, মোবাইল কোর্টের নামে রফা এবং একাধিক প্লট-ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রংপুরের মিঠাপুকুর থানার রূপসায় গ্রামের বাড়ি হামিদুল ইসলামের। তিনি দর্শনে এম.এ ডিগ্রিধারী। ২০০৭ সালের ৫ ডিসেম্বর সহকারী সচিব হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়ে ২০১৬ সালে উপ-পরিচালক এবং ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। বর্তমানে জোন-৫ এর দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা ২০৩৬ সালের ২৪ নভেম্বর অবসরে যাবেন। তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ও ২০ এপ্রিল ২০২৫ এবং ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দুদকে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।
নতুন অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি চাকরিতে যোগদানের কয়েক বছরের মধ্যেই আর্থিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটান। ২০১৬-১৭ সালে রাজউকে ড্রাইভার নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে কেরানীগঞ্জের শাহীন ও আব্দুল্লাহপুরের মতিনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে আদায় করেন। শাহীন পৈতৃক জমি বিক্রি করে এবং মতিন স্ত্রীর গহনা বিক্রি ও ঋণ করে টাকা দিলেও চাকরি হয়নি, টাকাও ফেরত পায়নি। মোঃ মাজেদুল ইসলামের আগের অভিযোগেও এ তথ্য উল্লেখ আছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরিচালক হিসেবে ইমারত পরিদর্শকদের এরিয়া বণ্টনের ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি ঘন ঘন এরিয়া পরিবর্তন করেন এবং মাসিক চাঁদা আদায় করেন। ইমারত পরিদর্শকদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এরিয়া বণ্টন করে পরে প্রতি মাসে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা নেন। তাঁর নির্দেশে অধীনস্থরা বিভিন্ন বাড়ির মালিকদের নোটিশ দিয়ে ভয় সৃষ্টি করেন। পরে টাকা নিয়ে নোটিশ গায়েব করে দেন। রাজউকের একজন অথরাইজড অফিসারও একইভাবে নোটিশ গায়েব করে টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন না।
মোবাইল কোর্ট সংক্রান্ত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে নিউ এলিফ্যান্ট রোডে হোল্ডিং-১১০, ১১১ ও ১১২ (মালিক কামরুল হাসান) এর ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পর ২০ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে পুনরায় কাজের সুযোগ করে দেওয়া হয়। একই এলাকার হোল্ডিং-৮২ (মালিক মিসেস রহিমা সাহাবুদ্দিন) এর ক্ষেত্রে আবাসিক অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগে মোবাইল কোর্টের পর ১৫ লাখ টাকা নিয়ে বিষয়টি চাপা দেওয়া হয়।
মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন হাউজিং, বসিলা, চাঁদ উদ্যান ও তেজতুড়ি বাজারসহ একাধিক ভবন মালিকের সাথে রফা করে মোটা অংকের অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তিনি অভিজ্ঞ ইমারত পরিদর্শকদের এরিয়া যথাযথভাবে না দিয়ে নতুন ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। ২০১০ সালের পর থেকে রংপুরে অধিক ফসলি জমি এবং ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের অভিযোগ আছে। শ্বশুরবাড়িতেও সম্পদ গড়েছেন বলে চাউর রয়েছে। রংপুরের লালপুকুর-মিঠাপুকুর এলাকার স্থানীয়রা জানান, এই সম্পদের বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করতে পারবেন না তিনি। বর্তমানে তিনি মোটা অংকের টাকা খরচ করে জোন-৪ (গুলশান) এ বদলি হওয়ার জন্য জোরালো লবিং চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “যেকোনো অভিযোগ এলে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে দেখি। ইতিমধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি দোষী প্রমাণিত হন, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বার্থে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মোঃ শাহজাহান আলী বলেন, “আমরা সব অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখি। কোনো অভিযোগ জমা পড়লে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর তদন্ত শুরু করা হয়। এই অভিযোগটিও যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেখা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ উদ্বেগজনক। নোটিশ বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা নাগরিকদের জীবনযাত্রা ও নগর পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনআস্থা নষ্ট হয়।”
সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে একাধিক বক্তব্য পাওয়া গেছে। ধানমন্ডির বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, “রাজউকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। নোটিশ দিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ শুনে আমরা ক্ষুব্ধ। দুদক যেন দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়।”
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, “আমাদের এলাকায়ও এ ধরনের ঘটনা শোনা যায়। পরিচালক যদি নিজেই জড়িত থাকেন, তাহলে নিচের কর্মকর্তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। জবাবদিহিতা চাই।” গুলশানের সচেতন নাগরিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “জোন পরিবর্তনের লবিংয়ের অভিযোগও গুরুতর। ক্ষমতার অপব্যবহার করে পদ বদলের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। দুদক যেন নিরপেক্ষ তদন্ত করে।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক মোঃ হামিদুল ইসলাম বলেন, “এসব অভিযোগ পুরোনো। আমি এসব অভিযোগের বিষয়ে জানি। এর আগে দুদকে অভিযোগ করা একজন তাঁর অভিযোগ তুলে নিয়েছেন। আমি আমার দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করি। কোনো অনিয়ম করিনি। তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।”
অভিযোগকারী মোহাম্মদ আব্দুল করিম জানান, “জনস্বার্থে এই অভিযোগ করছি। দুদক যেন দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, যাতে এ ধরনের দুর্নীতি বন্ধ হয়।”
রাজউক ও দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অভিযোগ জমা পড়ার পর প্রাথমিক যাচাই শেষে তদন্ত কমিটি গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে নাগরিক সমাজ ও স্বচ্ছতাবাদী সংগঠনগুলো দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছে। পরিচালক হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের পরিণতি কী হয়, তা এখন দুদকের তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স