ঢাকা , বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লিফট কিনতেই বাড়তি ৩২ কোটি! গৃহায়নে মিরাজের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

লিটন আলী
আপলোড সময় : ০২-০৯-২০২৬ ১২:৪২:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০২-০৯-২০২৬ ১২:৪২:০৪ অপরাহ্ন
লিফট কিনতেই বাড়তি ৩২ কোটি! গৃহায়নে মিরাজের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ



জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি ফ্ল্যাট প্রকল্প চলমান রয়েছে। দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা নামের এ প্রকল্পে ৪৩০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের অনুমোদিত প্রথম সংশোধনীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি লিফট কেনার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেখানে ৩১ কোটি টাকা বেশি খরচ করা হচ্ছে।

এ কেনাকাটার জন্য যেসব কোম্পনিকে কাজ দেওয়া হবে ইতোমধ্যে সেগুলোও ঠিক করা হয়েছে। শুধু লিফট নয়, এ প্রকল্পে ইএম বিভাগের আওতায় জেনারেটর, অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনসহ অন্যান্য কেনাকাটায়ও অনুমোদিত দরের চেয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেশি খরচ করা হচ্ছে। এ কাজের সঙ্গে জাগৃকের নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) মো. মিরাজ হোসেন জড়িত বলে জানা যায়।

নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসে গত দেড় যুগে ঢাকাসহ সারাদেশে কমপক্ষে ৩০টি প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যালের সব কেনাকাটা করেছেন এই মিরাজ। যার সবগুলোতেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) থেকে অনেক বেশি টাকা ব্যয় দেখান তিনি।
জাগৃক কর্মকর্তারা জানান, সরকার আসে সরকার যায় প্রকৌশলী মিরাজ থাকেন বহাল তবিয়তে। ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর যে বিভাগে বসেছেন আজও সেখানেই আছেন। নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসে গত দেড় যুগে ঢাকাসহ সারাদেশে কমপক্ষে ৩০টি প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যালের সব কেনাকাটা করেছেন এই মিরাজ। যার সবগুলোতেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) থেকে অনেক বেশি টাকা ব্যয় দেখান তিনি। সেই টাকা ঠিকাদারদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন। একাধিক কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।




স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্প-১, ২, মিরপুর ৩৬০ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া ৮৮ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া ৫৪ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া অফিসার্স কোয়ার্টার, লালমাটিয়া বাণিজ্যিক মার্কেট, যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্প, মিরপুর গ্রেনেড হামলা প্রকল্প, চট্টগ্রামে ৫টি ফ্ল্যাট প্রকল্প, কক্সবাজার ফ্ল্যাট প্রকল্প, বগুড়া ফ্ল্যাট প্রকল্প, দিনাজপুর ফ্ল্যাট প্রকল্প, সেগুনবাগিচা গৃহায়ন ভবন, যশোর ফ্ল্যাট প্রকল্পেও ইলেক্ট্রো ম্যাকানিক্যাল বিভাগে কেনাকাটায় পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) মানা হয়নি। এসব ডিপিপি যাচাই করলে সব তথ্য মিলবে।


জাগৃক কর্মকর্তারা বলেন, সর্বশেষ যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্পেও ১০ কোটি টাকার লিফট ১৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় কিনে আলোচনায় এসেছেন তিনি। কিন্তু ‘ম্যানেজ মাস্টার’ খ্যাত মিরাজ হোসেনের চেয়ার নড়ে না। এর বড় কারণ-লিফট কেনাকাটায় কৌশলী মিরাজ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের টোপে ফেলেন। এরপর এসব কর্মকর্তাকে ইচ্ছেমাফিক ডলার দিয়ে একটি স্বার্থক প্রমোদভ্রমণ দেওয়ার পর আর কেউ মিরাজ প্রশ্নে শব্দ করেন না


প্রকল্পে আরও যেসব ব্যয় বাড়ানো হয়েছে

‘ঢাকাস্থ মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের আসাদ এভিনিউতে (গৃহায়ন কনকচাঁপা) ও সাত মসজিদ রোডে (গৃহায়ন দোলনচাঁপা) প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪৬৯ কোটি ১৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪১ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা মূল ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।

তবে বৃদ্ধি পাওয়া মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৭২ কোটি টাকার মধ্যে কেবল লিফট কেনা বাবদই বাড়ানো হয়েছে ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। অথচ মূল প্রস্তাবে লিফট কেনার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, যা সংশোধিত প্রস্তাবে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন সংখ্যা ১০টি থেকে ৮টিতে নামালেও ব্যয় ৬ কোটি ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। বৃদ্ধি ২ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
এছাড়াও বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন সংখ্যা ১০টি থেকে ৮টিতে নামালেও ব্যয় ৬ কোটি ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। বৃদ্ধি ২ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

একইভাবে বৈদ্যুতিক জেনারেটর ১০টি থেকে ৮টিতে নামলেও ব্যয় ২ কোটি ৯১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। এ খাতে বাড়তি ব্যয় ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

বৈদ্যুতিক পাম্প-মোটর মূল প্রস্তাবে প্রতি সেট ৮ লাখ ৩০ হাজার করে ধরা হলেও, সংশোধনীতে প্রতি সেটের দাম ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। ফলে এই খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ লাখ ২১ হাজার টাকা।

নির্মাণ প্রকল্পটির নিরাপত্তাসংক্রান্ত অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থাপনা খাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এ খাতে মূল ব্যয় ছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। সংশোধনীতে জব সংখ্যা ১০টি থেকে কমিয়ে ২টি করলেও ব্যয় বাড়িয়ে ৯ কোটি ৮২ লাখ ১৭ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি ৩ কোটি ৩১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।


ফোর্স ভেন্টিলেশন খাতে ব্যয় ৪৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। এ খাতেও অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৯ হাজার টাকা।

যেভাবে একই চেয়ারে ১৯ বছর মিরাজ

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ডলার সংকটের কারণে ব্যয়সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে সরকার অর্থ ব্যয়ে কড়াকড়ি আরোপ করার সময়ও থেমে থাকেনি বিদেশ সফর। গৃহায়নের দুটি প্রকল্পে ৯ জন ভ্রমণ করেছে। লিফট কেনার নামে মিরপুরে (স্বপ্ননগর-২) ১৪ তলা আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের অর্থে প্রকৌশলী মিরাজ হোসেনসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিদেশ ঘুরে এসেছেন। ৮৮টি আবাসিক ফ্ল্যাট ও কর্মচারীদের জন্য ৫৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের টাকায় বেশ কয়েকজন সুইজারল্যান্ড সফর করেছেন। এসব কারণে সবার বদলি হলেও মিরাজ হোসেনের বদলি হয় না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম ডিভিশন) মো. মিরাজ হোসেন  বলেন, ‘আমাদের ডিভিডিপিতে ধরা ছিল ‘বি’ ক্যাটাগরি লিফট। পরে মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটি সিদ্ধান্ত দেয় ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফট ধরতে হবে। পিডব্লিউডি’র শিডিউল অনুযায়ী আমরা ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফট ধরেছি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধরা ক্যাটাগরির লিফট, যেগুলোর দাম এত বেশি– মানে, ডাবলের বেশি। পিডব্লিউডি শিডিউলের পরিবর্তন করে যে নতুন শিডিউল, যে দর হয়েছে সেটাই ধরেছি।’

দুর্নীতির সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মিনিস্ট্রিতে সমন্বয় সভা হয়। এই প্রকল্পের পিডি আছে, আমার অধীনস্থ লোকজন আছে, আমার হাই অফিসাররা আছে। ভাই, এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।’

দীর্ঘদিন এক পদে বহালের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে দেবে কোথায়, যাওয়ার তো জায়গা নাই।’

অতিরিক্ত দামে লিফট কেনার কারণ জানতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা: ফেরদৌসী বেগমকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা দিলে তিনি প্রতিউত্তরে লিখেন, ‘তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী আবেদন করুন। সকল তথ্য পাবেন।’



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ