ব্রিকস সম্মেলন: বাংলাদেশের অনুপস্থিতি ও কূটনৈতিক হিসাব
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৪-০৯-২০২৬ ০২:১৯:১৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৪-০৯-২০২৬ ০২:১৯:১৭ অপরাহ্ন
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের (BIMSTEC) চেয়ারম্যান হওয়ায় এই আমন্ত্রণ এসেছে। ফলে বিষয়টি নিছক ভারত সফরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতিরও সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু সম্মেলনের মাত্র দুদিন আগে, ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল পর্যন্ত ঢাকার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। বরং প্রকাশিত কূটনৈতিক সূত্রের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত সম্মেলনে কোনো প্রতিনিধি না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ গত কয়েকদিনের অনিশ্চয়তা এখন বাস্তব সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ এই সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে হচ্ছে।
বিষয়টিকে এখন আর নিছক সিদ্ধান্তহীনতা বলা যায় না। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছিলেন, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর কাছে কোনো নতুন তথ্য নেই। ৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। আর ১০ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বাংলাদেশ কোনো প্রতিনিধি না পাঠাতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এসব ঘটনা থেকে ধারণা করা যায়, ঢাকার নীরবতা হয়তো শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়। এর পেছনে সচেতন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব কাজ করছে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, সরকার অন্তত তিনটি বিষয় পাশাপাশি বিবেচনা করছে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য।
স্বাভাবিক কারণেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কই এই সিদ্ধান্তের মূল প্রেক্ষাপট। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ‘ব্রিকস সফর’কে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা কঠিন। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ ও ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে চায়, এমন কোনো প্রকাশ্য সংকেত নেই। বরং ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে ঢাকা-দিল্লি যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক ও যোগাযোগকেও দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের যাওয়া বা না যাওয়া একটি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সম্মেলনে গেলে বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু বাস্তব কূটনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারত।
প্রথমত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সুযোগ সৃষ্টি হতো। দুই দেশের সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করাও সম্ভব হতো।
দ্বিতীয়ত, এই মঞ্চে চীন, রাশিয়া, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া যেত।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারত যে, ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও ঢাকা কূটনৈতিক দরজা বন্ধ করছে না।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্রিকস এখন আর শুধু পাঁচটি দেশের পুরোনো অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়। এর সদস্যসংখ্যা বেড়েছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও সম্প্রসারিত হয়েছে। এবারের সম্মেলনে পশ্চিম এশিয়ার সংকট, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় থাকার কথা।
ঢাকা যদি মনে করে, এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি বড় রাজনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, অথচ শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনও হয়নি, তাহলে সরকার মনে করতে পারে—আগে সম্পর্কের ভিত্তি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, তারপর শীর্ষ পর্যায়ের সফর।
এটিও একধরনের কূটনৈতিক অবস্থান। এর সারকথা হতে পারে, ‘সম্পর্ক চাই, কিন্তু সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ একতরফা হবে না।’ এই অবস্থান থেকে ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়াকে সরাসরি ভারতবিরোধী পদক্ষেপ বলা যাবে না। বরং এটিকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও কম নয়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ব্রিকস সম্মেলনকে একটি বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করলে সেখানে অনুপস্থিত থাকার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া হবে।
বাংলাদেশের জন্য চীন ও ভারতের সঙ্গে একই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগের সুযোগ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ব্রিকসে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক নাও হতে পারে।
সবচেয়ে কৌশলী সমাধান হতে পারত, প্রধানমন্ত্রী না গেলেও একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠানো। এর মাধ্যমে ঢাকা একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিতে পারত—ভারতের সঙ্গে সব বিষয়ে আমরা একমত নই, কিন্তু বহুপক্ষীয় কূটনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছি না।
কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বরের কূটনৈতিক সূত্রের খবর যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিণত হয় এবং বাংলাদেশ কোনো প্রতিনিধি না পাঠায়, তাহলে সেটি অপেক্ষাকৃত শক্ত রাজনৈতিক বার্তা হবে। তখন প্রশ্ন উঠবে, ঢাকা কি দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অগ্রগতির অপেক্ষায় আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেই পাওয়া যাবে না। সিদ্ধান্তের ধরন, সময় এবং পরবর্তী কূটনৈতিক যোগাযোগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ব্রিকসের গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা, রপ্তানি বাজার, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত না ঝুঁকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। এই জায়গা থেকেই ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে ব্রিকসে অংশগ্রহণ বা অনুপস্থিতির সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কেবল ভারতবিরোধী অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং কৌশলগত ভারসাম্য।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাবেন কি না, এটি এখন আর কেবল একটি সফরসূচির প্রশ্ন নয়। এটি নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রতীকী পরীক্ষা।
যাওয়া হলে তার অর্থ হবে, বাংলাদেশ মতপার্থক্য সত্ত্বেও সংলাপের দরজা খোলা রেখেছে। না গেলে তার অর্থ হতে পারে, ঢাকা মনে করছে, সম্পর্কের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে কিছু মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন।
তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। এটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
দেখতে হবে, বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে সামনে রেখে এমন একটি কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারছে কি না, যেখানে কেউ বাংলাদেশের বন্ধু হওয়ার শর্ত হিসেবে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে প্রশ্ন করতে পারবে না।
ব্রিকসে বাংলাদেশের উপস্থিতির চেয়েও বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে নিজের জায়গাটি কতটা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স