ঢাকা , মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগও মূল ঘুষের রাজত্ব থেকে বিপুল সম্পত্তি: ধরাছোঁয়ার বাইরে গণপূর্তের প্রকৌশলী তামজিদ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২১-০৯-২০২৬ ০৬:৫৮:১০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২২-০৯-২০২৬ ১২:২৯:১৯ অপরাহ্ন
গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগও মূল  ঘুষের রাজত্ব থেকে বিপুল সম্পত্তি: ধরাছোঁয়ার বাইরে গণপূর্তের প্রকৌশলী তামজিদ
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নাম ব্যবহার করে কোটি টাকার বাণিজ্য, কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারে সরকারি অর্থ ছাড়, দরপত্রে কারসাজি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, ক্ষমতার দাপটে এক গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ গোপন রাখতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর এসব অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেন বাকী বিল্লাহ নামে এক নাগরিক।


অভিযোগ জমা হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হতে চললেও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা প্রশাসনিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং তদারকি সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। নথি কারসাজি থেকে শতকোটি টাকার সম্পদ অভিযোগসূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিয়ে ‘পার্সেন্টেজ’ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের কাজের বাস্তব অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অর্থ ছাড় করার তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।


এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, বিল-ভাউচার ও দরপত্রের কাগজপত্র যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব বলে অভিযোগকারী দুদকের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন।

তবে অভিযোগ দায়েরের পর এসব নথি যাচাই করে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগে উল্লেখিত প্রধান সম্পত্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ধানমন্ডির বিলাসবহুল স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট: ঢাকার ধানমন্ডি ২৭/১ এলাকায় রবীন্দ্র সরোবরের ৮ নম্বর ব্রিজের ঢালে অবস্থিত একটি বহুতল ভবনে প্রায় ৩,৫০০ বর্গফুটের স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। মোহাম্মদপুরে যৌথ ভবন: মোহাম্মদপুর ২৭/১, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটির টেক রোড-৭ এলাকায় শ্বশুর মো. জাহিদ মিয়ার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় নির্মিত সাততলা ভবন নির্মাণের অভিযোগও করা হয়েছিল। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।

রাজশাহীতে বিস্তৃত জমি: রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় তাঁর নামে ও বেনামে প্রায় ৩০ একর জমি থাকার দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে তদন্ত শুরু করলেই আসল সত্য উদঘাটিত হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ দুদক ও গণমাধ্যমের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে জানা যায়, ই/এম বিভাগ-৩-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল খালেক আকন ও নির্বাহী প্রকৌশলী এস. এম. মইনুল হকের ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।


ভিডিওটি ভাইরাল হবার পর পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রকৌশলী তামজিদ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্টদের ভয় দেখিয়ে বলেন, দুদক শীর্ষ কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি করেন। প্রাথমিক ধাপে ৩০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। গেল বছরের অক্টোবরে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী খালেক আকন একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে নগদ ১০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করছেন।

ভিডিওতে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল খালেক আকনকে মনস নামের এক ঠিকাদারকে বলতে শোনা যায়, “স্যার, আপনি ১০ লাখ চেয়েছিলেন, ১০ লাখই দিয়েছি…মালটা আপনি পৌঁছে দিয়েন।” এই ভিডিও প্রকাশের পরই জনৈক বাকি বিল্লাহ নামে একজন নাগরিক দুদকে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৌশলী তানজিদ শুধু টাকা আদায়েই থেমে থাকেননি, বরং দপ্তরের ভেতরে একাধিক ঠিকাদার ও কর্মচারীকে হুমকি দেন যেন কেউ মুখ না খোলে।


তিনি তখন বলেছিলেন, “আমি এখন বিষয়টি হ্যান্ডেল করছি, কেউ বাইরে কথা বললে ভালো হবে না।” একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভিডিও ভাইরালের পর প্রকৌশলী তামজিদ হোসেন নিজেই মইনুল হককে ফোন করে বলেন, “আপনাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট হতে যাচ্ছে। আমি সাংবাদিকদের ও দুদকের কর্মকর্তা আমার খুবই কাছের। দুদক চেয়ারম্যান আমার খুব পরিচিত। আমাকে দায়িত্ব দিন, সব ঠান্ডা করে দেব।” এই কথার পরপরই ঘুষকাণ্ডে জড়িত দুই কর্মকর্তা মিলে তানজিমকে ৫০ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ করেন, যা তিনি সাংবাদিক ও দুদকের সঙ্গে ‘ম্যানেজমেন্ট ফি’ বলে দাবি করেন।


এই টাকা আদায় করে সাংবাদিক এবং দুদকের নাম ভাঙিয়ে তিনি নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন-যা প্রকাশ্য চাঁদাবাজি এবং প্রতারণা বলে অভিযোগ করেন এক ঠিকাদার। তিনি অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মইনুল ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী খালেকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনের দাবিকৃত ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ৩০ লাখ টাকা দিলাম। বাকি ২০ লাখ টাকা কাজ শেষে দিব। ঝামেলা রেখে লাভ কী, সব মিট হয়ে যাক। চলার পথে ভুল-ত্রুটি হবেই।”


এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে একাধিক সংবাদকর্মী স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে দুদকে জমা হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনার ফলে সাংবাদিক ও দুদকের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি চালানোর মতো কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে অভিযোগ করেন ঠিকাদার আলাউদ্দিন ওয়াজেদ।


এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি সাংবাদিক ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার নাম ব্যবহার করে টাকা আদায় করেন, তাহলে তা সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা এবং দণ্ডনীয় অপরাধ অভিযোগকারীর দাবি ছিল, এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে ডিআরইউর এক সাংবাদিক নেতা জানিয়েছেন, “একটা ঘুষ ঢাকতে আরেকটা ঘুষ, তাও আবার সাংবাদিক ও দুদকের নাম করে! এটা তো দুবার দুর্নীতি।”

তিনি আরও বলেন, তামজিদকে তদন্ত করে শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তারা সাংবাদিক ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার নাম ভাঙিয়ে আরও ভয়াবহ অপরাধ করবে। গৃহকর্মী নির্যাতন ও নৈতিক স্খলনের গুরুতর তথ্য আর্থিক জালিয়াতির পাশাপাশি তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে সু–য়া নামের এক গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগও মূল অভিযোগে যুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়, ঘটনাটি জানাজানি হওয়া ঠেকাতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। এ ছাড়া দপ্তরের অন্যান্য সহকর্মী ও কর্মচারীদের জড়িয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানাকে ঘিরেও তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।


এ ছাড়া ভুট্টো নামে তামজিদ হোসেনের এক কর্মচারী-কাম-ঠিকাদার বিভিন্ন সময়ে তাঁকে নারীদের সঙ্গে হোটেলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছিল। এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং ফলোআপ প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা হবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করেও তার সংযোগ পাওয়া যায়নি।


সরকারি টিএন্ডটি নাম্বারেও একাধিকবার ফোন করলেও কেউ ফোন রিসিভ করেননি। তবে এর আগে সম্পূর্ণ বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কোনো বিশেষ গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে দুদকের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘদিন সংস্থায় কমিশন পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান থাকায় অনেক অভিযোগের অনুসন্ধান থমকে ছিল। তবে বর্তমানে পুরোনো সব অভিযোগ আমলে নিয়ে পুনরায় পর্যালোচনার কাজ চলছে এবং বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গণপূর্তের মতো স্পর্শকাতর দপ্তরের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ