ঢাকা , বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩৫৮ কোটি টাকার দুর্নীতির মামলায় মাহবুব দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের মামলায় রমজান দুই আসামি, রেলের গুরুত্বপূর্ণ পদে.

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৩-০৯-২০২৬ ১২:৪০:৫৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৩-০৯-২০২৬ ১২:৪০:৫৪ অপরাহ্ন
৩৫৮ কোটি টাকার দুর্নীতির মামলায় মাহবুব দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের মামলায় রমজান দুই আসামি, রেলের গুরুত্বপূর্ণ পদে.



অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন


৩৫৮ কোটি টাকার লাগেজ ভ্যান প্রকল্পে দুদকের মামলার আসামি মাহবুব এখন সরকারি রেল পরিদর্শক; রমজান আলীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের মামলা

বাংলাদেশ রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত দুই সাবেক কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। তাঁদের একজন আহমেদ মাহবুব চৌধুরী—১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনায় রাষ্ট্রের ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার অন্যতম আসামি। বর্তমানে তিনি সরকারি রেল পরিদর্শক (জিআইবিআর) পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদকের মামলা রয়েছে।

দুদকের মামলার তথ্য ও সরকারি নথি পর্যালোচনায় এ দুই কর্মকর্তার বিষয়ে এসব তথ্য পাওয়া যায়। তবে মামলাগুলোর অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

৩৫৮ কোটি টাকার লাগেজ ভ্যান প্রকল্পে মাহবুব

বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘রোলিং স্টক অপারেশনস ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের প্রায় ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ছয়জন রেল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর নামও রয়েছে।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় যথাযথ বাজার সমীক্ষা, সম্ভাব্যতা যাচাই, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের প্রকৃত চাহিদা এবং পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রকল্প প্রস্তাবে ভবিষ্যৎ আয় ও লাভের যে হিসাব দেখানো হয়েছিল, বাস্তব আয়ের সঙ্গে তার বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায়।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রকল্পটি থেকে ৩২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা মুনাফার প্রক্ষেপণ করা হলেও ২০২৪ সালের প্রথম আট মাসে প্রকৃত আয় হয় ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ পরিস্থিতিতে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনার সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের প্রায় ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।

মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৭৭ক ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার পরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে মাহবুব
দুদকের ওই মামলার পরও আহমেদ মাহবুব চৌধুরী রেলওয়ের চাকরিতে রয়েছেন। রেলপথ পরিদর্শন অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে তাঁকে বর্তমানে ‘সরকারি রেল পরিদর্শক (জিআইবিআর)’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল এ পদে যোগ দেন।
জিআইবিআর পদটি রেলপথ পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফলে দুদকের মামলার আসামি একজন কর্মকর্তার এমন সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব পালন নিয়ে রেলের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে শুধু মামলার আসামি হওয়া নিজেই দোষ প্রমাণের সমতুল্য নয়। মাহবুব চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে আইনগতভাবে দোষী বলা যায় না।
রমজান আলীর বিরুদ্ধে সম্পদ ও মানিলন্ডারিংয়ের মামলা-
অন্যদিকে, বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধেও দুদকের মামলা রয়েছে।
প্রকাশিত দুদক-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রমজান আলীর বিরুদ্ধে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৮০ হাজার ২৮৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়।
মামলাটির অভিযোগের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীকেও পৃথকভাবে আসামি করা হয়েছিল বলে প্রকাশিত নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
চাকরি থেকে অপসারণের পরও প্রভাবের অভিযোগ-
রমজান আলীকে ঘিরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুদকের মামলার পর তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়। একই সঙ্গে কিছু প্রতিবেদনে তাঁকে রেলের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করা হয়েছে।
ডিজি পদ দখলের চেষ্টায় –
আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বর্তমানে জিআইবিআর পদে থাকায় তাঁর ভবিষ্যৎ পদায়ন নিয়েও রেল অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে মহাপরিচালক পদে আগ্রহী এবং এ বিষয়ে তদবিরের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে তাঁর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
একইভাবে রেলের বর্তমান মহাপরিচালক দক্ষ ও অভিজ্ঞ
প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেনকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো প্রচেষ্টার সঙ্গে মাহবুব-রমজানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও বিভিন্ন মাধ্যমে এসেছে।
নথি, তদন্ত ও জবাবদিহির প্রশ্ন
লাগেজ ভ্যান প্রকল্পের বিষয়ে দুদকের মামলাটি নিজেই রেলওয়ের ক্রয়প্রক্রিয়া, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রকল্প অনুমোদন ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে প্রকল্পের প্রত্যাশিত আয় ও বাস্তব আয়ের পার্থক্য এবং বাজার সমীক্ষার ঘাটতির বিষয়গুলো দুদকের অভিযোগে গুরুত্ব পেয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের প্রশাসনিক ও নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাহবুব ও রমজান: অভিযোগের চিত্র-
কর্মকর্তা| মামলার অভিযোগ| বর্তমান/সর্বশেষ দায়িত্বের তথ্য
আহমেদ মাহবুব চৌধুরী| ১২৫টি লাগেজ ভ্যান ক্রয়ে রাষ্ট্রের প্রায় ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ| ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সরকারি রেল পরিদর্শক (জিআইবিআর); সরকারি ওয়েবসাইটে এ পদে তাঁর নাম রয়েছে
মো. রমজান আলী| ২ কোটি ৪৩ লাখ ৮০ হাজার ২৮৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ| সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক; মামলার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
রেলওয়ের মতো রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়ের প্রশ্ন নয়; এটি সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প যাচাই এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়ও।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ