গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ এবং গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ—তদন্তের জোর দাবী
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৭-০৯-২০২৬ ১২:৪৭:১৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৭-০৯-২০২৬ ১২:৪৭:১৩ অপরাহ্ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচারে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, কমিশন বাণিজ্যসহ গুরুতর নানা অভিযোগ উঠেছিল প্রায় এক বছর আগে। এসব অভিযোগে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ দায়েরের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দৃশ্যমান তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত শুরু করেছিল কি না, করলেও তার অগ্রগতি কী—সেটিও জানা যায়নি।
বাকী বিল্লাহ নামে এক ব্যক্তি ওই লিখিত অভিযোগে সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়েছিল, ২০১৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদানের পর তামজিদ হোসেন ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ ছাড় এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছিল।
অভিযোগকারীর দাবি ছিল, বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ ছাড় করে মোটা অংকের কমিশন হাতিয়ে নিয়েছিল। দরপত্র প্রক্রিয়াতেও অনিয়ম ও কারসাজির মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।
এসব অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, বিল-ভাউচার ও দরপত্রের কাগজপত্র যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব বলে অভিযোগকারী দুদকের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন। তবে অভিযোগ দায়েরের পর এসব নথি যাচাই করে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এখনো।
লিখিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছিল, দুদক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে ই/এম বিভাগ-৫-এর এই কর্মকর্তা ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেছিলেন।
অভিযোগকারীর দাবি ছিল, এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে চাঁদাবাজির অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক লেনদেনের নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ
আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে এক গৃহকর্মীকে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়েছিল। অভিযোগে গৃহকর্মী সুফিয়ার নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, তাকে ধর্ষণের পর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে রফাদফা করা হয়েছিল।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো মামলা, আদালতের নথি, তদন্ত প্রতিবেদন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ধর্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ওই অভিযোগে তামজিদ হোসেনের নামে ও বেনামে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকার ধানমন্ডি ২৭/১ এলাকায় রবীন্দ্র সরোবরের ৮ নম্বর ব্রিজের ঢালে একটি বহুতল ভবনে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের কথা উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারীর হিসাবে ওই সম্পত্তির মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুর ২৭/১, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটির টেক রোড-৭ এলাকায় শ্বশুর মো. জাহিদ মিয়ার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় সাততলা একটি ভবন নির্মাণের অভিযোগও করা হয়েছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় তামজিদ হোসেনের নামে ও বেনামে প্রায় ৩০ একর জমি থাকার দাবিও করা হয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লেখ করা এসব সম্পদের মালিকানা, প্রকৃত মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি নথি বা যাচাইকৃত তথ্য প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
অভিযোগকারী, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর দুদকের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর প্রায় এক বছর হতে চললেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগটি দুদকের কোন শাখায় পাঠানো হয়েছিল, অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল কি না, কিংবা প্রাথমিক অনুসন্ধানে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ভুয়া বিল, ঘুষ, দরপত্রে অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদের মতো অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা
অভিযোগকারীর দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তামজিদ হোসেনের দায়িত্ব পালনকালের প্রকল্পের নথি, বিল-ভাউচার, দরপত্রের কাগজপত্র, ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি এবং তার নামে থাকা সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করা উচিত।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তার দাবি, এসব অভিযোগের সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন। কে বা কারা এবং কী উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছে, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন বলে জানান।
অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয় দীর্ঘদিন দুদকে কমিশন না থাকার কারনে অনেক অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রম সামনে আগায়নি, তবে বর্তমান কমিশন গঠিত হওয়ার পর আমরা পুরাতন সব অভিযোগ আমলে নিয়ে পুন:তদন্ত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি ।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স