ঢাকা , সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবসরের আগে প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়

মিস্টার ফাইভ পারসেন্ট’ আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৮-০৯-২০২৬ ০১:৫০:৫৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৮-০৯-২০২৬ ০১:৫০:৫৯ অপরাহ্ন
মিস্টার ফাইভ পারসেন্ট’ আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ





আগামী ১ অক্টোবর শুরু হচ্ছে তার অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল)। চাকরির মেয়াদ অবশিষ্ট আছে এক মাসেরও কম। অথচ এই শেষ সময়ে এসে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পদ ‘প্রধান প্রকৌশলী’ বাগিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের। পটপরিবর্তনের এই সময়ে অধিদপ্তরের অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে টাকার জোরে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে সরিয়ে পদটি দখলে নিতে জোর তদবির ও দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে সরাতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করাচ্ছেন আবুল খায়ের। মূলত এই অপপ্রচারকে হাতিয়ার করেই নিজের পথ পরিষ্কার করতে চাইছেন তিনি।

ছাত্রলীগ কোটা ও ফ্যাসিবাদের তোষামোদ
কর্মজীবনে বরাবরই রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এই প্রকৌশলী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সুপারিশ এবং ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ পরিচয়ে গোপালগঞ্জ জোনে পোস্টিং বাগিয়ে নেন তিনি। সেখানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম ও তার পরিবারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে গোটা অধিদপ্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।

ফ্যাসিবাদের তোষামোদেও পিছিয়ে ছিলেন না তিনি। ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে সরকারি অর্থে ‘মুজিব কর্নার’ ও ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’ নির্মাণ করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি।

সর্বত্র পরিচিত ‘মিস্টার ৫%’ নামে
বর্তমানে ঢাকা জোনের দায়িত্বে থাকা আবুল খায়ের গণপূর্ত অধিদপ্তরে ‘মিস্টার ৫%’ নামেই বেশি পরিচিত। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও বড় বড় প্রজেক্টের অনুমোদন কিংবা বিল পাস—সবখানেই ৫% নগদ কমিশন নেওয়াকে তিনি অলিখিত নিয়মে পরিণত করেছেন।

যেখানে পোস্টিং, সেখানেই লুটপাটের সিন্ডিকেট
গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রংপুর, কুমিল্লা হয়ে ঢাকা—যেখানেই আবুল খায়েরের পোস্টিং হয়েছে, সেখানেই তিনি নজিরবিহীন দুর্নীতি ও টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

চট্টগ্রামে ৩০০ কোটির প্রকল্পে হরিলুট: চট্টগ্রাম জোনে থাকাকালীন প্রতিটি কাজে ৩% নগদ কমিশন বাধ্যতামূলক করেন তিনি। আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ৯টি ২০ তলা ভবন নির্মাণের প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পে লীগপন্থি তিন ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। নকশা পরিবর্তন ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের এই ঘটনায় দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানেও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে।

কুমিল্লায় এমপির তোপের মুখে বদলি: কুমিল্লা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালে টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব বাধে। এমপির তীব্র আপত্তির মুখে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

গৃহায়নে ৫০ কোটির কেলেঙ্কারি: জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে (এনএইচএ) দায়িত্ব পালনকালে প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দ এবং নকশা অনুমোদনে জালিয়াতি করে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্ত্রীর আগমনে ২০ লাখ টাকার উৎসব!
ক্ষমতার অপব্যবহারের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন রংপুর জোনে। চলতি বছরের ২ জুন তার স্ত্রীর রংপুর আগমন উপলক্ষে শহরের গ্র্যান্ড প্যালেস হোটেলে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এক বিলাসবহুল ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও মিলনমেলা’র আয়োজন করা হয়। স্থানীয় ঠিকাদার ও অধস্তনদের টাকায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান গণপূর্তের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। রংপুরে তার বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে অতিষ্ঠ ঠিকাদাররা দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি টেলিভিশনে (চ্যানেল ৭১) লাইভ সাক্ষাৎকারে অভিযোগও জানিয়েছিলেন।

গড়েছেন সম্পদের পাহাড়
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের টাকায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন আবুল খায়ের।

২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট: ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার নিজের ও স্বজনদের নামে অন্তত ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে।

মূল্যবান প্লট ও জমি: পূর্বাচল ও মোহাম্মদপুরের মতো এলাকায় রয়েছে একাধিক দামি প্লট।

খামারবাড়ি: ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি ও খামারবাড়ি কিনেছেন এই প্রকৌশলী।

এসব গুরুতর অভিযোগ এবং প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ঝাঁপ প্রসঙ্গে জানতে মো. আবুল খায়েরের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ