জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে ১৯ বছরের ‘সিন্ডিকেট রাজত্ব’: হত্যা মামলা ও দুদকের আসামি হয়েও বহাল তবিয়তে ৩ প্রকৌশলী
লিটন আলী
আপলোড সময় :
০১-১০-২০২৬ ০৮:৩১:১৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-১০-২০২৬ ০৮:৩১:১৮ অপরাহ্ন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা, অর্থায়ন, সরকারি জমি দখল এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও স্বপদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমান। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু করে টানা ১৯ বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করে তিনি একটি বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মিরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার মোর্শেদ এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন।
গণঅভ্যুত্থান দমনে অর্থায়ন ও হত্যা মামলা: অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় মো. হারিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১২ মে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে করা ওই মামলায় হারিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়ে সন্ত্রাসী হামলা ও সহিংসতার অন্যতম মূল অর্থদাতা হিসেবে অভিযোগ আনা হয়েছে।
৭ একর জমি দখল ও ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ: সংস্থাটির সাবেক ও বর্তমান একাধিক সূত্রে জানা যায়, পল্লবীর ঝিলপাড় এলাকায় প্রায় ৭ একর সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রেখে টিনের ঘর নির্মাণের মাধ্যমে ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা অবৈধভাবে ভাড়া আদায় করা হয়। তৎকালীন ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর যোগসাজশে তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমান এই দখলের মূলে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ দণ্ডবিধির ৪০৯, ২১৭, ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-২৯) বিচারাধীন রয়েছে। পরবর্তীকালে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি কতৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে জমিটি পুনরুদ্ধার করে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ঢাকায় ১৯ বছরের শিকড়: ছাত্রশিবিরের সাবেক রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার পরিচয় থাকলেও হারিজুর রহমান টানা ১৯ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকায় প্রভাবশালী পদ বাগিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও পুরনো সহযোগীদের নিয়ে তিনি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের ঢাকায় বদলিতে বাধা সৃষ্টি করছেন।
তার অন্যতম সহযোগী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার মোর্শেদ (সাবেক ছাত্রলীগ নেতা) ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনও টানা ১৯ বছর ধরে ঢাকায় কর্মরত। সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধেও অবৈধ অর্থ সংগ্রহের একাধিক অভিযোগ দুদকে তদন্তাধীন।
স্বপ্ননগর ও দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা প্রকল্পে জালিয়াতি: মিরপুর-৯ নম্বর সেকশনের ‘স্বপ্ননগর-২য় পর্ব’ প্রকল্পে প্রায় ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকার অকেজো মালামাল গোপনে বিক্রি করে নথিপত্রে মাত্র ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা দেখিয়ে সরকারের বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে। এই সিন্ডিকেটের অর্জিত অবৈধ অর্থে বসিলা, ধানমন্ডি, উত্তরা, পাবনা ও গাজীপুরে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার তথ্য উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের ‘দোলনচাঁপা’ ও ‘কনকচাঁপা’ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকাকালীন হারিজুর রহমান প্রকল্পের মূল ব্যয় ৪৬৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪১ কোটি ১১ লাখ টাকায় উন্নীত করেন। একই সাথে কলোনির মূল ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দকৃত ২৫৩টি ফ্ল্যাট কমিয়ে ১১৮টি করা হয় এবং বাকি ১৬৬টি ফ্ল্যাট তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী, আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার অভিযোগ রয়েছে।
গ্রাহক ভোগান্তি ও তদন্তের অগ্রগতি: ঢাকা সার্কেলের সাধারণ সেবাগ্রহীতারা দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ এবং দালাল সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে এসব অভিযোগ নিয়ে দুদক, থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তদন্ত পরিচালনা করলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পদে বহাল থাকায় সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স