ময়মনসিংহ কারাগার প্রকল্প ৫ প্রকৌশলীর গাফিলতিতে এক যুগ ধরে ধুঁকছে
লিটন আলী
আপলোড সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০২:৫৬:১৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০২:৫৬:১৮ অপরাহ্ন
ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৫ সালে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিন বছরের প্রকল্প শেষ করতে এক যুগ সময় লেগে যাবে তা অনেকটা অবিশ্বাস্য! সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে কেন এমন সময় ক্ষেপণ হলো– এমন তথ্য খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর নাম। যে যখন দায়িত্বে ছিলেন কাজের কাজ কিছু না হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ম্যানেজ হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম বিলও দিয়ে গেছেন। আর প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে চলছে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের কার্যক্রম। একইসঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
কারাগার প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ভালো। দ্রুতই কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। তবে যেসব কাজ অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো আলাদা প্যাকেজ করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী,
ময়মনসিংহ গণপূর্ত জোন
অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপূর্তের ময়মনসিংহ জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কারাগারের সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা পাঁচ নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিহ্নিত করা গেছে, যারা এ কাজে গাফিলতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তারা হলেন এ কে এম কামরুজ্জামান, মো. বদরুল আলম, মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মো. মোবারক হোসেন এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস। এছাড়া এই সময়ে কারাগার নির্মাণে দায়িত্ব পালন করেন আরও দুই নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামান চুন্নু ও রাশেদ হাসান।
গণপূর্ত সূত্রে জানা যায়, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম কামরুজ্জামান বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী (উন্নয়ন) হিসেবে। মো. বদরুল আলম বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (রিজার্ভ) হিসেবে যুক্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ময়মনসিংহ গণপূর্ত জোন) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘কারাগার প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ভালো। দ্রুতই কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। তবে যেসব কাজ অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো আলাদা প্যাকেজ করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
গণপূর্তের একাধিক সূত্র জানায়, প্রকল্প অনুমোদনের পরও নির্মাণকাজ শুরু হতে কিছুটা সময় লাগে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এসব প্রকৌশলীর কেউই প্রকল্পের কাজ দেরিতে শুরু হওয়ার পর বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রিভাইজড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরডিপি) অনুমোদনের উদ্যোগ নেননি। এ কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লোকসান থেকে বাঁচতে কাজের গতি কমিয়ে দেয়। ঠিকাদার ধীর গতিতে কাজ করে গেলেও তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম কামরুজ্জামান, মো. বদরুল আলম, মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মো. মোবারক হোসেন এবং বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম বিল দিয়ে গেছেন, আর সেখান থেকে নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন।
জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতেই পরিকল্পনাগত বিভিন্ন সমস্যা ছিল। পর্যাপ্ত মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় দুই হাজার বন্দির আবাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান, গুদাম ও ওয়াচ টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনার নকশা ও পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। ভবনের আয়তন ও নকশা সংশোধনের প্রয়োজনও দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা থেকে ২৪০ কোটি টাকায়। একইসঙ্গে কাজের প্যাকেজ ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়।
জানা যায়, সম্প্রসারণ এই প্রকল্পের আওতায় ছোট-বড় প্রায় ৪০টি স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব স্থাপনার মধ্যে একতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত বিভিন্ন উচ্চতার ভবন রয়েছে। পাশাপাশি ফাঁসির মঞ্চ ও ডে-টাইম ল্যাট্রিনের মতো স্থাপনাও নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নারী বন্দিদের জন্য নির্ধারিত অংশের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। পুরুষ বন্দিদের ভবনের একটি অংশ ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণ চলছে। তবে এখনো বাকি রয়েছে কনডেমড সেল, সিকিউরিটি সেল, রান্নাঘর, আটা কল, জেল, স্কুল ও লাইব্রেরির কাজ।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পের শুরু থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমি সেখানে দায়িত্বে ছিলাম। তখন কারাগারে বন্দি থাকায় দ্রুত কাজ শুরু করা যায়নি। তাদের অন্যত্র শিফট করে তারপর কাজ শুরু করতে হয়েছে। যার কারণে কাজ ধীরগতিতে হয়।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম বিল দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক আগের ঘটনা এটি। এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না।’
ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘২০১৮ সালের দিকে আরডিপি সংশোধন না হওয়ার কারণে ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। পরে মে মাসেই আরডিপি সংশোধন হলে কাজ শুরু হয়।’
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স