শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়ে ‘অনিয়ম-দুর্নীতির’ অভিযোগ!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০৩:২৭:১১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০৩:২৭:১১ অপরাহ্ন
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারমুখী যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই সেতু দিয়ে পারাপার হয় এবং আদায় হয় বিপুল পরিমাণ সরকারি টোল। কিন্তু সেই টোল আদায় ও হিসাব সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে।
সাম্প্রতিক অভিযোগের কেন্দ্রে এসেছে টোল আদায়ের স্বচ্ছতা, যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা, টোকেন/রসিদ প্রদান এবং আদায়কৃত অর্থের সঙ্গে সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া অর্থের সামঞ্জস্য। এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি কতটা হচ্ছে, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী (চ: দা:) মো. মাইদুল ইসলামের দায়িত্বে শাহ আমানত সেতুর টোল ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন টোল আদায়ে জড়িত কর্মচারীরা।
টোকেন ছাড়া টোল আদায়ের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শাহ আমানত সেতুতে টোল আদায় নিয়ে এর আগেও গণমাধ্যমে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে টোকেন না দিয়ে টাকা আদায় এবং আগের প্রিন্ট করা রসিদ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। এবং রশিদ দিলেও রশীদে গাড়ীর নাম্বার উল্লেখ থাকে না, লেখা থাকে শুধু চার ডিজিটের শূন্য। এখনো সেই প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী। এই অনিয়মের কারণে সরকার মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, টোকেন ছাড়াই টোল আদায়ের অভিযোগের পাশাপাশি মাসভিত্তিক মোট টোল আদায়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রকাশ করে না সওজ। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে—প্রতিদিন সেতু দিয়ে কত যানবাহন পার হচ্ছে, তার বিপরীতে কত যানবাহনের কাছ থেকে টোল আদায় হচ্ছে এবং আদায়কৃত অর্থের পুরোটা সরকারি হিসাবে জমা হচ্ছে কি না?
হিসাবের অমিলেই কি লুকিয়ে আছে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ?
তথ্য সূত্রে জানা যায়, যানবাহনের সংখ্যা ও টোল আদায়ের হিসাব নথিভুক্ত করা টোল আদায় কারি প্রতিষ্ঠানের এবং সওজ কর্তৃপক্ষ তা তদারকি করবে। কিন্তু টোল আদায় বেড়ে গেলে, এবং পরিমাণ কমে গেলে ওই সময়ে কত যানবাহন সেতু পার হয়েছে—সে তথ্য দিতে পারেনা সংশ্লিষ্ট টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান। এখনো সেই অনিয়ম চলছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সওজের এক কর্মকর্তা জানান, শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়ে সংঘবদ্ধ সিণ্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া কখন কিভাবে আদায় করা টোল মেরে দেয় কেউও টের পায় না, এই টাকার একটি প্যাকেট প্রতিদিন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে চলে যায়। এই চেয়ারে শুধু তিনি নন যেই বসে সেই হরিলুটের সঙ্গে জড়িত।
সরকারি (ই-জিপি) নথিতে দেখা যায়, শাহ আমানত সেতুর তিন বছরের (Web-Based Toll Collection, Operation and Management) সেবার জন্য চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের মাধ্যমে একটি ক্রয়প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রাক্কলিত ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ টোল ব্যবস্থাপনা কেবল টাকা সংগ্রহের বিষয় নয়, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন গণনা, টোল হিসাব, ডাটা সংরক্ষণ, অর্থ জমা এবং সরকারি রাজস্বের হিসাব মিলিয়ে দেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই অবস্থায় অভিযোগ উঠছে—সওজ থেকে এসব কার্যক্রমের যথাযথ তদারকি হচ্ছে কি না এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর সিণ্ডিকেটের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ?
একাধিকবার অভিযোগ, তারপরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
শাহ আমানত সেতুর টোল ব্যবস্থাপনা নিয়ে শুধু রাজস্বের হিসাব নয়, টোল প্লাজায় যানজট এবং অটোমেশন নিয়েও আগেও সমস্যা প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে আরএফআইডি ও এএনপিআর ক্যামেরা, অনিবন্ধিত যানবাহন এবং টোল আদায়ের প্রক্রিয়ার জটিলতার কথা উঠে আসে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা থাকার পরও যদি টোল আদায় ও যানবাহনের সংখ্যার মধ্যে অসঙ্গতি থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়? এভাবেই কি সংঘবদ্ধ সিণ্ডিকেট মাসের পর মাস টোল আদায়ে কি হরিলুট করে যাবে?
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়ে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রতিদিনের যানবাহন চলাচলের ডাটা, প্রতিটি লেনের টোল আদায়ের হিসাব, টোকেন ও রসিদের সিরিয়াল,
সফটওয়্যার/সার্ভারের লগ, সিসিটিভি ফুটেজ, দৈনিক আদায়কৃত অর্থের ব্যাংক জমা, সরকারি কোষাগারে জমার চালান, টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের বিল ও পেমেন্ট, এবং সওজের তদারকি প্রতিবেদন পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। তখন থলের বিড়াল দ্রুত বেরিয়ে আসবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে—নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের যানবাহন চলাচলের সংখ্যা বনাম টোল আদায়ের অর্থ—এই দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলেই কোনো ঘাটতি বা অসঙ্গতি আছে কি না, তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মাইদুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম টোল ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে জানা গেছে, তিনিও সুকৌশলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছেন নিয়মিত, সওজ অফিসের নির্দিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও টোল আদায়কারীরা মাইদুলের সহযোগী বলে জানা যায়, তারা কখন কি ভাবে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করবে তার হিসাব পানির মত সচ্ছ। কারণ এই দপ্তরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীরাও টোল আদায়ে হরিলুট করেছেন বলে সওজের সুত্রে জানা গেছে
নির্ভরযোগ্য সূত্র আরও জানিয়েছেন, প্রতিদিন লাখ লাখ সরকারি টাকা মাইদুলের পকেটে ঢুকে, এটা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চলমান প্রক্রিয়া, এখানে যেই নির্বাহী প্রকৌশলী আসুক টোলের টাকা তাদের কাছে স্ব-সম্মানে পৌছে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয় নির্বাহী প্রকৌশলী মাইদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি
শাহ আমানত সেতুর টোল আদায় সরকারি রাজস্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে এখানে সামান্য অনিয়মও সরকারের আর্থিক ক্ষতির কারণ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সওজের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দুদকের তদন্ত ও নিরপেক্ষ অডিট বা তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে টোল আদায়ের সম্পূর্ণ ডাটা জনসম্মুখে প্রকাশ এবং প্রতিদিনের যানবাহন সংখ্যা ও আদায়কৃত অর্থের স্বয়ংক্রিয় মিল নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
উল্লেখ্য— চট্টগ্রামের কর্ণফুলী (শাহ আমানত) সেতুর টোল আদায়ের জন্য ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কোম্পানি ‘সেল-ভ্যান জেভি’ তারা চুক্তির মাধ্যমে শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজায় স্বয়ংক্রিয় ও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টোল আদায় এবং সেতুর সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে আসছিল, কিন্তু তাদের মেয়াদ শেষ হওয়াতে বর্তমানে সওজের সড়ক বিভাগ নিজস্ব পদ্ধতিতে টোল আদায় করছে বলে জানা গেছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স