ঢাকা , বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ , ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাস্টম হাউস ঢাকা

সুবিধার বিনিময়ে পণ্য খালাসের অভিযোগ সহকারী কমিশনার সাকিবের বিরুদ্ধে

লিটন আলী
আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০১:১১:১৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০১:১১:১৬ অপরাহ্ন
সুবিধার বিনিময়ে পণ্য খালাসের অভিযোগ সহকারী কমিশনার সাকিবের বিরুদ্ধে




৩৫ হাজার টাকা শুল্ক-কর নির্ধারণে খালাস, পরে ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্‌ঘাটন **শ্রমিকের এনআইডি ব্যবহার করে পাঁচ দিনে ৪০টি বিল অব এন্ট্রি খালাসের অভিযোগ


কাস্টম হাউস ঢাকার কুরিয়ার ইউনিটে দায়িত্ব পালনকালে সুবিধা নিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য চালান খালাস করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খানের বিরুদ্ধে। বিসিএস ৪০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যাচাই-বাছাই ছাড়াই পণ্য চালান খালাস, সরকারের রাজস্ব ক্ষতি এবং ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে পণ্য ছাড়ের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ একটি চালানে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা শুল্ক-কর নির্ধারণ করে পণ্য খালাসের পর কাস্টম হাউসের তদন্তে প্রায় ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ছাড়া একজন শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পাঁচ দিনে প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রির পণ্য খালাসের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ঢাকা কাস্টম হাউস ও তাঁর সাবেক কর্মস্থল রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে এসব অভিযোগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

সূত্র জানায়, গত ২৩ আগস্ট ঢাকা কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে ফুলএভার বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান পণ্য চালান আমদানি করে। চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৯৯২৬২৩। প্রতিষ্ঠানটি কাগজ ঘোষণা দিয়ে আরএফ লেভেল খালাস করে নিয়ে যায়। এ চালানে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা শুল্ক-কর নির্ধারণ করে পণ্য খালাসের অনুমতি দেন কুরিয়ার ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান।

বিষয়টি কাস্টম হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এলে তাঁরা তদন্ত শুরু করেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, প্রতিষ্ঠানটি কাগজের আড়ালে আরএফ লেভেল নিয়ে গেছে। এতে সরকারের প্রায় ৭৬ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে ঢাকা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। তবে পণ্য চালানটি সাকিব আনাম খান খালাস করে দেওয়ার পর মামলা হওয়ায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কোনো শুল্ক-কর আদায় করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া কুরিয়ারের আরও ৩১টি চালানে লক দিয়েছে প্রিভেন্টিভ টিম। সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে কাস্টম হাউস ঢাকা অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে।

কাস্টম হাউসের কুরিয়ার ইউনিট মূলত নমুনা পণ্য আমদানির জন্য নির্ধারিত। অর্থাৎ ঋণপত্র (এলসি) ছাড়া যেসব নমুনা পণ্য আমদানি করা হয়, সেগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে খালাস করার নিয়ম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি বছরে প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করতে পারেন। কিন্তু সাকিব আনাম খান দায়িত্ব নেওয়ার পর কুরিয়ার ইউনিট বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের পণ্য খালাসের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে ফ্রেইটের তুলনায় কুরিয়ার ইউনিটে বেশি বিল অব এন্ট্রি দাখিল হচ্ছে। অথচ বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের পণ্য সাধারণত ফ্রেইটের মাধ্যমে আমদানির কথা। সুবিধার বিনিময়ে পণ্য চালান খালাসের সুযোগ থাকায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য কুরিয়ার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টম হাউস ঢাকার কমিশনার রইচ উদ্দিন খান কালবেলাকে বলেন, কুরিয়ার ইউনিটে একজন আমদানিকারক মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য চালান খালাস করেছেন। পরে কাস্টম হাউসের তদন্তে সেখানে আরএফ লেভেল পাওয়া গেছে। এতে সরকারের প্রায় ৭৬ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী পণ্য চালান পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, শুধু ফুলএভার বিডির চালান নয়, সাকিব আনাম খানের বিরুদ্ধে কুরিয়ার ইউনিটে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মিত এ ধরনের পণ্য চালান খালাসের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পাঁচ দিনে প্রায় ৪০টি পণ্য চালান খালাসের অভিযোগ উঠেছে। ডেল্টা কার্গো মিডিয়ার নামে এসব পণ্য চালান খালাস করা হয়। ভুয়া এনআইডি ব্যবহারের অভিযোগ ওঠা চালানগুলোর বিল অব এন্ট্রি নম্বর হলো—১০৯৯৬৯৫, ১০৯৯৭৫৬, ১০৯৯৭৪৫, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭৩০, ১০৮৮৭০২, ১০৮৮৭১২, ১০৮৪৬৪২, ১০৮৪৫৪৮, ১০৮৩৩৪৫, ১০৮৩৩৩৯, ১০৮৩৩৫৪, ১০৮৩৩৫১, ১০৭৯৬৯২, ১০৮০৯৩৭, ১০৭৮৭১৮, ১০৮০৯৮২ ও ১০৭৯৪৭৮সহ প্রায় ৪০টি বিল অব এন্ট্রি।

এসব অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সাকিব আনাম খানকে ঢাকা কাস্টম হাউসের অন্য একটি শাখায় বদলি করা হয়েছে। সূত্রের দাবি, তিনি কুরিয়ার ইউনিটে দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে দুটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। এসব সিন্ডিকেট বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে তাঁর মাধ্যমে পণ্য চালান খালাস করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বন্ডের ফেব্রিকস থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক পণ্য পর্যন্ত মিথ্যা ঘোষণায় কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে খালাসের বিষয়টি ঢাকা কাস্টম হাউসে ওপেন সিক্রেট বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুরিয়ার ইউনিটে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পণ্য খালাসের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে এক প্রতিষ্ঠানমালিকের নামে কুরিয়ারের মাধ্যমে নকল সিগারেটের ব্যান্ডরোল আমদানি করা হয়। ব্যান্ডরোল আটকের পর পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে শুল্ক ফাঁকির মামলা করে কাস্টম হাউস। পরে দেখা যায়, যাঁর নামে ব্যান্ডরোল আমদানি করা হয়েছে, তিনি প্রকৃতপক্ষে পণ্যটি আমদানি করেননি। তাঁর পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। পরে নিজের পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়মের ঘটনায় ওই প্রতিষ্ঠানমালিক থানায় মামলাও করেন।

এ ছাড়া কুরিয়ার ইউনিটের আগে অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপে দায়িত্ব পালনকালে সুবিধা না পেলে প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে সাকিব আনাম খানের বিরুদ্ধে। এর আগে রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) পদায়ন করা হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর দুই মাসের মাথায় তৎকালীন রাজশাহী ভ্যাট কমিশনার তাঁকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সাকিব আনাম খান ফুলএভার বিডিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কম মূল্য ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে শুল্ক ফাঁকির মামলা হয়েছে।

তবে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, পণ্য চালানে এত টাকা শুল্ক-কর আদায়যোগ্য হওয়ার পরও কীভাবে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে খালাস দেওয়া হলো? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।


নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ