মাহফুজুর রহমান.
আকাশটা আজ বড্ড ভারী হয়ে আছে। যেন কোনো এক বিষণ্ণ চাদর ঢাকা দিয়ে রেখেছে পুরো শহরকে। যে নেত্রীর একটি ডাকে রাজপথ প্রকম্পিত হতো লক্ষ মানুষের পদভারে, আজ তিনি শান্ত। নিথর। দীর্ঘ লড়াই, কারাবাস, অসুস্থতা আর একাকীত্বের প্রহর শেষ করে বেগম জিয়া আজ চিরস্থায়ী শান্তির পথে।
হাসপাতালের করিডোর থেকে শুরু করে রাজপথের মোড় পর্যন্ত মানুষের ঢল। কারো চোখে জল, কারো মুখে স্তব্ধতা। কর্মী-সমর্থকদের ভিড় ঠেলে যখন তাঁর কফিনটি এগিয়ে চলছে, তখন সবার মনেই ভেসে উঠছে সেই চিরচেনা চিত্র—মাথায় শাড়ি টেনে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলা এক নারী, যিনি কোনোদিন মাথানত করেননি।
মানুষের মুখে মুখে আজ একটাই কথা, "আপসহীন নেত্রী চললেন তাঁর আজীবনের সঙ্গীর কাছে।"
স্মৃতির পাতায় ধুলো জমেছে অনেক, কিন্তু মোছেনি সেই দৃশ্যগুলো। তরুণী খালেদা থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যাত্রা। সেই উত্তাল সময়গুলোতে সেনাপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন তাঁর শক্তি। স্বামীর অকাল প্রয়াণের পর যে পতাকা তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তা বয়ে চলেছেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
মাঝখানে কেটে গেছে কয়েক দশক। জেল-জুলুম, রাজনীতি আর ব্যক্তিগত শোক—সবই তিনি সামলেছেন অসীম ধৈর্যের সাথে। কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে আজ বিরতির ডাক এসেছে।
কফিনটি যখন ধীরে ধীরে তাঁর স্বামীর কবরের পাশে নিয়ে আসা হলো, তখন যেন চারপাশের কোলাহল হঠাৎ থেমে গেল। দীর্ঘ কয়েক দশকের দূরত্ব আজ ঘুচে যাচ্ছে। রাজনীতির মাঠের লড়াই, ক্ষমতার পালাবদল আর একাকীত্বের যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছেন সেখানেই, যেখান থেকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল।
মাটি যখন তাঁকে ছুঁয়ে দিল, তখন উপস্থিত সবার মনে হলো—এটি কেবল একটি বিদায় নয়, এটি এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার সমাপ্তি। মহাকালের আবর্তে হারিয়ে যাওয়ার আগে তিনি প্রমাণ করে গেলেন, ক্ষমতা বা সম্পদ নয়, দিনশেষে মানুষের ভালোবাসাই টিকে থাকে।
"জীবন যুদ্ধের বিরতি হলো আজ,
মহাকালের যাত্রী হলেন তিনি।
স্বামীর পাশেই পরম মমতায়,
ঠাঁই নিলেন ইতিহাসের সেই অপরাজেয় নারী।