ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এবারেরটিসহ সর্বশেষ পাঁচটি নির্বাচনে সবচেয়ে কম নারী প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন এবারই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এবারেরটিসহ সর্বশেষ পাঁচটি নির্বাচনে সবচেয়ে কম নারী প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন এবারই।
এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও নারী প্রার্থী ছিলেন ৮১ জন, যা মোট প্রার্থীর ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আর ২৯৯ আসনের মধ্যে নির্বাচিত নারী প্রার্থী সাতজন, যা মাত্র ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয় কর্তৃক প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ১৯ জন নারী। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২৩ জন নারী সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ২২ জন এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন ১৯ জন নারী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নেই। যোগ্যতাসম্পন্ন হলেও এখনো সমাজের একাংশ মনে করেন নারীরা নেতৃত্বদানে সক্ষম নন। এছাড়া নারীদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের হারও বেশি। এসব কারণেই নারীরা রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘শুধু এবারের নির্বাচনই না, সব নির্বাচনে নারী এমপি প্রার্থীর সংখ্যা কম থাকে। এর মূল কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। রাজনীতিতে অবস্থান তৈরি করতে নারীদের দল থেকে, পরিবার থেকে সহযোগিতা পাওয়া জরুরি। আমাদের দেশে এ জায়গাগুলোতে ঘাটতি আছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায় থেকে নারীদের তুলে আনার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো রূপরেখা নেই। আরেকটি বিষয় হল আমাদের রাজনীতিতে এখনও অর্থ ও পেশিশক্তির আধিপত্য আছে। নারীদের পেশি শক্তি নেই, আবার আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকেন না তারা। যার কারণে তারা রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারেন না। সার্বিকভাবে রাজনৈতিক রূপরেখার পরিবর্তন ছাড়া আমাদের নারীরা উঠে আসতে পারবে না।’
নির্বাচনী তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এবারে নারী প্রার্থীর সংখ্যাও ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনে ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেয়ার ব্যবস্থা রেখে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা হয়। তবে কোনো রাজনৈতিক দলই এ শর্ত মানেনি। এমনকি নির্বাচনে প্রার্থী দেয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দল একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। এ নির্বাচনে ১ হাজার ৮৪২ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৬৫ জন। সে হিসাবে মাত্র ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারী ছিলেন।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবার বা শক্ত রাজনৈতিক ব্যাকআপ ছাড়া নারীদের রাজনীতিতে টিকে থাকার বাস্তব সুযোগ এখনো সৃষ্টি হয়নি। এবারের নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন ও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানানো জরুরি। তবে একই সঙ্গে কঠিন বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে, যদি কোনো নারী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য না হন, পুরুষ রাজনৈতিক আত্মীয় না থাকেন কিংবা দলের ভেতরে শক্ত পৃষ্ঠপোষকতা না পান, তাহলে তার রাজনৈতিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা—এ তিনটি বিষয়ই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। এবারের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এবার নির্বাচিত সাত নারীর মধ্যে ছয়জনই বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। অপরজনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এ বাস্তবতা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় প্রশ্ন ও চাপ তৈরি করে। কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, বাকি দলগুলো নারীদের নেতৃত্বে আনতে ব্যর্থ, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে। এ ব্যর্থতাকে শুধু দলীয় দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক ও কাঠামোগত সংকট হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারী রাজনীতিবিদদের জন্য আলাদা ও কার্যকর নীতি, সুরক্ষা কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা তৈরি করা জরুরি। এ সংকটকে হালকাভাবে নয়, বরং এক ধরনের জাতীয় রাজনৈতিক সংকট বা “ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি” হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।’
এ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা বিএনপি ২৮৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে নারী মাত্র ১০ জন, যা দলটির মোট প্রার্থীর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন লাভকারী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি। আর তরুণদের দল হিসেবে পরিচিত এনসিপির ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১০ জন।
এবারে ভোটের মাঠে লড়াই করে জয় পেয়েছেন সাতজন। অতীতের পাঁচ নির্বাচনের তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর তুলনায় নারীদের জয়ের হারও কম, যা ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ২০২৪-এর নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের জয়ের হার ছিল ২০ দশমিক ২১ শতাংশ। ওই নির্বাচনে মোট ৯৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং জয়ী হয়েছিলেন ১৯ জন।
এবারের বিজয়ী নারী প্রার্থীরা হলেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতা, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ কামাল, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা এবং নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন পুতুল। তাদের মধ্যে ছয়জনই বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। আর স্বতন্ত্র শুধু রুমিন ফারহানা। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি।
নির্বাচনে জয়ী এ সাতজন নারীই রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা। মানিকগঞ্জ সদর ও সাঁটুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা সাবেক মন্ত্রী হারুনুর রশীদ খান মুন্নুর মেয়ে। তিনি ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (রিকশা প্রতীক) প্রার্থী মুহাম্মদ সাঈদ নূর পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট।
ফরিদপুর-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও মন্ত্রী কেএম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে। তিনি ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (রিকশা প্রতীক) মো. আকরাম আলী পান ৮৯ হাজার ৩০৫ ভোট।
ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী চৌধুরী নায়াব ইউসুফ কামাল জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক। তিনি সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের কন্যা। তিনি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মো. আবদুত তাওয়াব পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ১১৫ ভোট।
ঝালকাঠি-২ (সদর-নলছিটি) আসনে বিএনপি প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো বিজয়ী হয়েছেন। তিনি নিহত সংসদ সদস্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর স্ত্রী। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ৪১৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এসএম নেয়ামুল করিম পেয়েছেন ৭০ হাজার ৫৫৬ ভোট।
বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসনে জয়ী হয়েছেন তাহসিনা রুশদীর লুনা। তিনি নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী। লুনা পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট।
নাটোর-১ আসনে ১ লাখ ২ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ফারজানা শারমিন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবুল কালাম আজাদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৯০ হাজার ৫৬৮ ভোট।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেত্রী রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাঁস প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি প্রয়াত ডেমোক্রেটিক লীগ নেতা অলি আহাদের মেয়ে। রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জমিয়তে উলামায়ের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯২৭ ভোট।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা দেখেছি নারীকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে আনার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের উৎসাহের অভাব রয়েছে। যেখানে তাদের একটা প্রতিশ্রুতিও ছিল ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেয়া হবে। সেটাও বাস্তবে দেয়া হয়নি। নির্বাচনে সংগ্রাম করে উঠে এসেছে সাতজন নারী।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের নীতি নির্ধারণী কমিটিসহ সব স্তরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং আরপিও অনুযায়ী ধীরে ধীরে ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। নারী নেতৃত্ব রাতারাতি তৈরি হয় না, তাদেরকে সময় দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে, সামনে আনার জায়গা করে দিতে হবে।’