বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি মাত্র ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধানে একটি বদলি আদেশ জারি এবং পরে তা রহস্যজনকভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে যেন খেলনার মতো ব্যবহার করে এমন নজিরবিহীন ঘটনার পেছনে শক্তিশালী প্রভাব বলয় এবং বিপুল অংকের আর্থিক লেনদেন জড়িত থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে জোর গুঞ্জন উঠেছে।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ মার্চ উপপরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিকি স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়। ওই আদেশে স্মারক নম্বর উল্লেখ করা হয় ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫.৪৯৮। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দাপ্তরিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে এই বদলি আদেশ জারি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সাধারণত এ ধরনের বদলি আদেশ সরকারি দপ্তরের নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও এ ক্ষেত্রে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় অস্বাভাবিক দ্রুততায়।
বিস্ময়করভাবে, মাত্র একদিন পর ৯ মার্চ সেই আদেশ রহস্যজনকভাবে বাতিল করে নতুন নির্দেশ জারি করা হয়। নতুন আদেশে স্মারক নম্বর দেওয়া হয় ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৫২৫ এবং এতে স্বাক্ষর করেন বিআরটিএর আরেক উপপরিচালক (প্রশাসন) হেমায়েত উদ্দিন। মাত্র ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধানে একই কর্মকর্তাকে ঘিরে এমন পরস্পরবিরোধী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রভাবশালী মহলের চাপের ফল।
বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বদলি আদেশ জারি হওয়ার পরপরই শুরু হয় ব্যাপক তৎপরতা। বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা চলে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রচেষ্টা সফল হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই বলছেন, এমন ঘটনা বিআরটিএর ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এবং বাইরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই বিআরটিএর ভেতরে শক্তিশালী প্রভাব বলয় তৈরি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট, যারা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য, কমিশন আদায় এবং ঘুষের লেনদেন পরিচালিত হয়—এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্ট মহলের।
বিআরটিএর ভেতরের অনেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখা কার্যত একটি প্রভাবশালী বলয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই বলয়ের বাইরে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে তাকে নানা ধরনের প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় কাগুজে অভিযোগ তুলে অন্যত্র বদলি করার ভয়ও দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পরিচালক শহীদুল্লাহকে অনেকেই ‘ঈগল চোখী’ কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ তিনি যখনই কোনো সার্কেলে পরিদর্শনে যান, তখন নানা কৌশলে সংশ্লিষ্ট সার্কেল থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে কর্মকর্তাদের চাপের মধ্যে ফেলে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঘুষ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, কমিশন আদায় এবং মাসোহারা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রোড পারমিট শাখাকে ঘিরে দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন সংশ্লিষ্ট নানা সেবা পেতে হলে অনেক ক্ষেত্রেই দালালদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ দিতে হয়, যার একটি অংশ প্রভাবশালী মহলের কাছে পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে এবং এর পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ঘুষ বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও এই অংকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে বি-ব্লকের ১৩/এ/১ নম্বর শেলটেক চন্দ্রমল্লিকা ভবনে তার একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে ১২/ঠ/৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে মার্বেল পাথর খচিত একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ির মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।
শুধু রাজধানীতেই নয়, ঢাকার শহরতলি গাজীপুরের জয়দেবপুর ও চন্দনা এলাকাতেও তার নামে বা বেনামে আরও দুটি বাড়ির অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে তার মাসিক বেতন ছিল সর্বসাকুল্যে ৬৫ হাজার ৪৬২ টাকা। কিন্তু সেই আয়ের তুলনায় তার জীবনযাত্রা অনেক বেশি বিলাসবহুল বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যে ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্টে তিনি বসবাস করেন, তার ভাড়াই তার মাসিক বেতনের কয়েকগুণ বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি বিশেষ সূত্রের দাবি, মাঝেমধ্যেই তিনি স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যান। বিশেষ করে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভ্রমণের কথাও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ভ্রমণের ব্যয়ভার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভেতরেও।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তাকে হঠাৎ করেই ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। গত ২৩ জুন জারি করা এক অফিস আদেশে তাকে সদর দপ্তরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিআরটিএ সদর দপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, এর আগে গত ৪ মার্চের নির্দেশনায় তাকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি।
পরবর্তীতে ৬ এপ্রিলের নির্দেশনা অনুযায়ী বদলির দুই সপ্তাহের মধ্যে যোগদানের কথা থাকলেও সাড়ে তিন মাসেও তিনি যোগদান করেননি বলে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে তাকে অবমুক্ত করে ২৬ জুনের মধ্যে সদর দপ্তরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) স্বদেশ কুমার দাসকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ঢাকা বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে সম্প্রতি বদলি আদেশ জারি এবং তা বাতিলের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, মাত্র ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধানে এমন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে শক্তিশালী প্রভাব বলয় এবং অস্বচ্ছ লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিআরটিএর ভেতরের অনেক কর্মকর্তা বলছেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে বদলি আদেশ বাতিলের পেছনে কারা জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে এত দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলো—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর বক্তব্য জানার জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ মার্চ উপপরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিকি স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়। ওই আদেশে স্মারক নম্বর উল্লেখ করা হয় ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫.৪৯৮। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দাপ্তরিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে এই বদলি আদেশ জারি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সাধারণত এ ধরনের বদলি আদেশ সরকারি দপ্তরের নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও এ ক্ষেত্রে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় অস্বাভাবিক দ্রুততায়।
বিস্ময়করভাবে, মাত্র একদিন পর ৯ মার্চ সেই আদেশ রহস্যজনকভাবে বাতিল করে নতুন নির্দেশ জারি করা হয়। নতুন আদেশে স্মারক নম্বর দেওয়া হয় ৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৫২৫ এবং এতে স্বাক্ষর করেন বিআরটিএর আরেক উপপরিচালক (প্রশাসন) হেমায়েত উদ্দিন। মাত্র ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধানে একই কর্মকর্তাকে ঘিরে এমন পরস্পরবিরোধী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রভাবশালী মহলের চাপের ফল।
বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বদলি আদেশ জারি হওয়ার পরপরই শুরু হয় ব্যাপক তৎপরতা। বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা চলে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রচেষ্টা সফল হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই বলছেন, এমন ঘটনা বিআরটিএর ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এবং বাইরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই বিআরটিএর ভেতরে শক্তিশালী প্রভাব বলয় তৈরি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট, যারা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য, কমিশন আদায় এবং ঘুষের লেনদেন পরিচালিত হয়—এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্ট মহলের।
বিআরটিএর ভেতরের অনেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখা কার্যত একটি প্রভাবশালী বলয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই বলয়ের বাইরে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে তাকে নানা ধরনের প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় কাগুজে অভিযোগ তুলে অন্যত্র বদলি করার ভয়ও দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পরিচালক শহীদুল্লাহকে অনেকেই ‘ঈগল চোখী’ কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ তিনি যখনই কোনো সার্কেলে পরিদর্শনে যান, তখন নানা কৌশলে সংশ্লিষ্ট সার্কেল থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে কর্মকর্তাদের চাপের মধ্যে ফেলে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঘুষ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, কমিশন আদায় এবং মাসোহারা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রোড পারমিট শাখাকে ঘিরে দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন সংশ্লিষ্ট নানা সেবা পেতে হলে অনেক ক্ষেত্রেই দালালদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ দিতে হয়, যার একটি অংশ প্রভাবশালী মহলের কাছে পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে এবং এর পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ঘুষ বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও এই অংকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে বি-ব্লকের ১৩/এ/১ নম্বর শেলটেক চন্দ্রমল্লিকা ভবনে তার একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে ১২/ঠ/৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে মার্বেল পাথর খচিত একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ির মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।
শুধু রাজধানীতেই নয়, ঢাকার শহরতলি গাজীপুরের জয়দেবপুর ও চন্দনা এলাকাতেও তার নামে বা বেনামে আরও দুটি বাড়ির অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সরকারি চাকরির বেতন দিয়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে তার মাসিক বেতন ছিল সর্বসাকুল্যে ৬৫ হাজার ৪৬২ টাকা। কিন্তু সেই আয়ের তুলনায় তার জীবনযাত্রা অনেক বেশি বিলাসবহুল বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যে ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্টে তিনি বসবাস করেন, তার ভাড়াই তার মাসিক বেতনের কয়েকগুণ বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি বিশেষ সূত্রের দাবি, মাঝেমধ্যেই তিনি স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যান। বিশেষ করে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভ্রমণের কথাও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ভ্রমণের ব্যয়ভার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভেতরেও।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তাকে হঠাৎ করেই ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। গত ২৩ জুন জারি করা এক অফিস আদেশে তাকে সদর দপ্তরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিআরটিএ সদর দপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, এর আগে গত ৪ মার্চের নির্দেশনায় তাকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি।
পরবর্তীতে ৬ এপ্রিলের নির্দেশনা অনুযায়ী বদলির দুই সপ্তাহের মধ্যে যোগদানের কথা থাকলেও সাড়ে তিন মাসেও তিনি যোগদান করেননি বলে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে তাকে অবমুক্ত করে ২৬ জুনের মধ্যে সদর দপ্তরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) স্বদেশ কুমার দাসকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ঢাকা বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে সম্প্রতি বদলি আদেশ জারি এবং তা বাতিলের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, মাত্র ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধানে এমন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে শক্তিশালী প্রভাব বলয় এবং অস্বচ্ছ লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিআরটিএর ভেতরের অনেক কর্মকর্তা বলছেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে বদলি আদেশ বাতিলের পেছনে কারা জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে এত দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলো—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর বক্তব্য জানার জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।