শীর্ষ ২০ খেলাপি কোম্পানির ১১টিই এস আলমের

আপলোড সময় : ০৭-০৪-২০২৬ ০১:৪৮:৪০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৭-০৪-২০২৬ ০১:৪৮:৪০ অপরাহ্ন



জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানই বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম গ্রুপের। এছাড়া দুটি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ ও সিকদার গ্রুপের। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তালিকা প্রকাশ করলেও তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ জানাননি।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ জানতে চান, দেশে এই মুহূর্তে প্রকৃত খেলাপি ব্যাংক ঋণের পরিমাণ কত, শীর্ষ ২০ খেলাপি কারা, খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে এবং সংসদ সদস্যদের ব্যাংক ঋণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত।

হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির তালিকা সংসদে তুলে ধরেন। মন্ত্রীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লি., এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লি., এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লি., এস আলম কোল্ড রোলেড স্ট্রিলস লি., সোনালি ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লি., গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লি., চেমন ইস্পাত লি., এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লি., ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লি., কেয়া কসমেটিকস লি., দেশবন্ধু সুগার মিলস লি., পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লি., পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লি., প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লি., কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লি., মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি, বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লি. এবং রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড।

শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান এস আলমের। সেগুলো হলো, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লি., এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লি., এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লি., এস আলম কোল্ড রোলেড স্ট্রিলস লি., সোনালি ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লি., চেমন ইস্পাত লি., এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লি., ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লি., মুরাদ এন্টারপ্রাইজ এবং কর্ণফুলী ফুডস।

এছাড়া খেলাপির তালিকায় বেক্সিমকো গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লি. ও বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লি.। আর সিকদার গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান হলো পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লি. ও পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লি.। প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের দুই পুত্র রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদার এই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন।

এছাড়া বিএনপির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খানের প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লি. শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় রয়েছে। শীর্ষ খেলাপির তালিকায় থাকা দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেডের মালিক হলেন গোলাম মোস্তফা এবং কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের মালিক আবদুল খালেক পাঠান। এরপর খেলাপির তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রয়াদ সংসদ সদস্য আসলামুল হকের মালিকানাধীন সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি। এরপর রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেডের কর্ণধার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রফিকুল ইসলাম।


ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এস আলম গ্রুপের কারণে আওয়ামী সরকারের আমলে ডজনখানেক ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। এস আলমের লুটপাটের কারণে এখন ইসলামী ধারার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তারল্য সংকটে থাকা এই পাঁচ ব্যাংক মিলে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে। এছাড়া প্রায় ৭৮ লাখ আমানতকারীর জন্য আমানত বীমা তহবিল থেকে মাথাপিছু ২ লাখ টাকা করে মোট ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সেই তহবিল থেকে টাকা পরিশোধও করা হচ্ছে।

এছাড়া ব্যাংক খাতে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। সিকদার গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ডিসেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মোট ঋণের তিন হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি।

হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরেন। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, শীর্ষ ২০ খেলাপির ঋণ আদায়ের অগ্রগতি যাচাই, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন তৈরি, খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ এবং তফসিলি ব্যাংকের নীতিমালা হালনাগাদকরণ।

ফেনী-২ আসনের সরকারদলীয় এমপি জয়নাল আবদিনের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসব থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত অর্থায়নে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তাসহ জ্বালানি সাশ্রয়ে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক অস্থিরতা, পণ্যমূল্যের চাপ, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিগত সময়ের নানা অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও দেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও গতিশীল করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে, আরো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।

এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অর্থনীতির ভিত মজবুত করা, মানুষের কষ্ট লাঘব করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাদিহি বাড়ানোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

কুষ্টিয়া-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে স্থিতিশীলতা, সংস্কার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও সুশাসনভিত্তিক সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।

২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি

ঢাকা-১৮ আসনের সরকার দলীয় এমপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার। বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মাইলফলক অর্জন করা। এ লক্ষ্যে সরকার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, স্পোর্টস অর্থনীতি ইত্যাদিকে বিবেচনা করে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে।

অর্থমন্ত্রী আরো জানান, জনগণের মাথাপিছু আয় বাড়ানোর জন্য কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি, প্রবাসী আয়, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সব কটি দিক একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার।


সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com