মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহে পড়ছে না বলে দাবি করেছে সরকার। নিয়মিত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হচ্ছে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) লো-ফিডে (ধীরগতি) চালু রেখে বিকল্প ব্যবস্থায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মনির হোসেন চৌধুরী। দেশের জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থা সন্তোষজনক বলেও উল্লেখ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
গতকালও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য গ্রাহকদের মধ্যে হাহাকার অবস্থা দেখা গেছে। কোনো কোনো পাম্প বন্ধ থাকলেও অধিকাংশ পাম্পে সরবরাহ বেড়েছে বলে জানান পাম্প মালিকরা। আবার কোথাও কোথাও গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কোনো কোনো গ্রাহক তিন/চারটি পাম্প ঘুরে জ্বালানি তেল পেয়েছেন বলে জানান।
মজুতকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধারে সরকার জোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে বলেও জানান জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মনির হোসেন। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ চার হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন একাধিক মন্ত্রী ও উপদেষ্টা। এ বিষয়ে সুপারিশ তৈরির জন্য মন্ত্রিসভা কমিটিও গঠন করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মার্চে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ক্রুড
অয়েল না পৌঁছানোয় ইআরএলকে সীমিত সক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। কারণ নিয়মিত আমদানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে মার্চে দুই লাখ টন এবং এপ্রিলে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে আনা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরব থেকে মার্চের শুরুতে এক লাখ টন তেলবাহী জাহাজ নরডিক্স পোলাক্স রাস্তানুরা বন্দরে অবস্থান করছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজটি হরমুজ অতিক্রম করতে পারেনি। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসার কথা আরেকটি জাহাজও স্থগিত করা হয়েছে। তবে বিকল্প পথে সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
তিনি আরো বলেন, এক লাখ টন এরাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল নিয়ে একটি জাহাজ ২০ এপ্রিল রওনা দিয়ে ২-৩ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া মে মাসে আরো এক লাখ টন ক্রুড অয়েল সরবরাহের জন্য সৌদি আরবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জরুরি চাহিদা মেটাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরো এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সীমিত পর্যায়ে ইআরএলের উৎপাদন অব্যাহত রেখে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে।
মজুত পরিস্থিতির বিষয়ে মনির হোসেন জানান, বর্তমানে দেশে এক লাখ এক হাজার ৩৮৫ টন ডিজেল, ৩১ হাজার ৮২১ টন অকটেন, ১৮ হাজার ২১১ টন পেট্রোল, ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন ফার্নেস ওয়েল এবং ১৮ হাজার ২২৩ টন জেট ফুয়েল রয়েছে। এ মজুত আগামী দুই মাসের জন্য পর্যাপ্ত বলেও জানান তিনি।
ইস্টার্ন রিফাইনারির বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন বলেন, এখানে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত থেকে ‘এরাবিয়ান লাইট’ ক্রুড অয়েল আনা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ ও এপ্রিলে আমাদের নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী ক্রুড অয়েল আনতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। আগের মজুদ দিয়ে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছি। রিফাইনারির চারটি ইউনিটের মধ্যে দুটি ইউনিট পুরোদমে চালু আছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির এ সাময়িক সীমাবদ্ধতা সরবরাহ চেইনে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও জানান তিনি।
তেলের দাম বাড়তে পারে
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসতে পারে বলে জানান তিনি। গতকাল সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আমেরিকা আবার ইরানের সঙ্গে রিলেটেড জাহাজগুলো ব্লকে দিচ্ছে। সুতরাং এটা যদি কার্যকর হয় এবং লম্বা সময় থাকে পরিস্থিতি আসলেই খারাপের দিকে যাবে। খুব লম্বা সময় ভর্তুকি দিয়ে যাওয়া আসলে কঠিন।
তিনি বলেন, এপ্রিলে দাম বৃদ্ধি করব না। যদি এটা কন্টিনিউ করে দামের কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।
এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, জ্বালানির মূল্য নিয়ে সরকারের আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘলাইন
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে গতকালও দীর্ঘলাইন দেখা গেছে। তিন/ চারদিন আগে যেসব পাম্প বন্ধ ছিল, গতকাল সেগুলোও খোলা দেখা গেছে। তবে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন রয়েছে। কোনো কোনো গ্রাহক চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি তেল নিয়েছেন।
মোটরসাইকেলের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং করে জীবিকা নির্বাহ করেন এমন ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। যাত্রাবাড়ী এলাকার দেলোয়ার হোসেন আমার দেশকে বলেন, সূর্য ওঠার আগেই কাজলা পাম্পে এসে লাইন ধরেছি। তাও প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে। পাঁচশ টাকার তেল পেয়েছি, তখন বাজে সকাল ৯টা। দিনের বাকি সময়ে যতটুকু পারা যায়, ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করব। তিনি বলেন, এটিই আমার একমাত্র উপার্জনের পথ। কষ্ট হলেও আমাকে জ্বালানি তেল নিতে হচ্ছে।
রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনের পেট্রোল পাম্পের লাইন সেগুনবাগিচা ঘুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে গিয়ে ঠেকেছে। পরিবাগের পাম্পে তেল নিতে আসা গ্রাহকদের গাড়ি ও মোটরসাইকেলের লাইনের শেষ মাথা দেখা গেছে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে পর্যন্ত। মতিঝিলের পেট্রোল পাম্পের লাইন আরামবাগ ছাড়িয়ে গেছে। তবে বেশ কয়েকটি পাম্পে ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে সরকারি গাড়ির সংখ্যাই বেশি দেখা গেছে।
পাম্পগুলোতে উপচেপড়া ভিড়ের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে পাম্পগুলোতে ভিড় বা ভোগান্তির প্রধান কারণ ‘প্যানিক বায়িং’। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে আমরা যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করতাম, এখনো তাই করছি। কিন্তু মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ কাজ করছে যে, ভবিষ্যতে কী হবে। ‘ট্রাস্ট’ পাম্পে আগে দৈনিক ৫০-৫৪ হাজার লিটার অকটেন লাগত, গতকাল আমরা সেখানে ৮০ হাজার লিটারের বেশি সরবরাহ করেছি। তবুও লাইন শেষ হচ্ছে না। আমি জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, তেলের কোনো ঘাটতি নেই, তাই অতিরিক্ত মজুতের প্রয়োজন নেই।