জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য ফার্নিচার না কিনেই ৪ কোটি টাকা বিল পরিশোধের নামে তা লোপাট করার প্রমাণ মিলেছে প্রাথমিক তদন্তে। ফার্নিচার না নিয়েই কার্যাদেশ দেওয়ার দুদিনের মধ্যে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী বর্তমানে উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ প্রকল্পে কর্মরত মো. আইয়ুব আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার যোগসাজশে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ টাকা তুলে আত্মসাৎ করার খবর গত ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কাছে সম্প্রতি পাঠানো প্রাথমিক প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গণপূর্ত অধিদফতর অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নিলেও বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভার্টিক্যাল এক্সটেনশনের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম তলার জন্য প্রথম দফায় ৯৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকার আসবাবপত্র কেনার জন্য ২০২২ সালের ১৮ মে দরপত্র আহ্বান এবং ৫ জুন দরপত্র গ্রহণ করা হয়। দরপত্র মূল্যায়নের পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আদিব এন্টারপ্রাইজকে ১৯ জুন চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আর ফার্নিচার না নিয়েই ২২ জুন পুরো বিল পরিশোধ করা হয়।
একইভাবে দ্বিতীয় দফায় ১ কোটি ৬৫ লাখ ৭২ হাজার টাকার আসবাবপত্র কেনার জন্য ২০২২ সালের ২ জুন দরপত্র আহ্বান ও ১৯ জুন দরপত্র গ্রহণ করা হয়। দরপত্র মূল্যায়নের পর ১৯ জুন একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আদিব এন্টারপ্রাইজকে ২৬ জুন চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আর বিল পরিশোধ করা হয় কার্যাদেশ দেওয়ার পরের দিন ২৭ জুন। প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও আসবাবপত্র না নিয়েই বিল দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য সোফা, চেয়ার, টেবিল, কম্পিউটার টেবিল, স্টিলের আলমারিসহ ৪ কোটি টাকা মূল্যের ১ হাজার ৫৮০টি বিভিন্ন ফার্নিচার কেনার জন্য আদিব এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে ফার্নিচার সরবরাহ না নিয়ে বিল পরিশোধ করে পুরো টাকা আত্মসাৎ করেন। তার সঙ্গে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীও জড়িত। নির্বাহী প্রকৌশলী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী হওয়ায় এ নিয়ে এতদিন কেউ কোনো কথা বলার সাহস পায়নি। সম্প্রতি বিষয়টি ধরা পড়ার পর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারের বিভিন্ন কাজের জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত করে সেই টাকা দিয়ে ফার্নিচারগুলো কেনার উদ্যোগ নেন।
অন্যদিকে ২০২১-২২ অর্থবছরে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) জন্য ফার্নিচার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হাতিলের ফার্নিচার দেওয়ার কথা থাকলেও তা না দিয়ে বাইরে থেকে নিম্নমানের প্রায় ৪ কোটি টাকার ফার্নিচার বানিয়ে হাতিলের স্টিকার লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়ে। পরে সব নকল ফার্নিচার ফেরত দিয়ে হাতিলের ফার্নিচার দিতে বাধ্য করা হয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে। এ ছাড়া দেশের ৩৭টি সার্কিট হাউস সম্প্রসারণ প্রকল্পের ফার্নিচার ক্রয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আইয়ুব আলী ও সংশ্লিষ্ট উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর অনিয়ম নিয়েও রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ।
এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রথম দফার কাজটির মধ্যে ৪৪টি এবং দ্বিতীয় দফায় কাজের মধ্যে ১৬টি কাঠের কেবিনেট ও লকার স্থান সংকুলানের জন্য সরবরাহ করা যায়নি। এ ছাড়া বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (বিপিএসসি) তাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কতগুলো আইটেমের আসবাবপত্রের অভিযোগ পাওয়ার পর সেগুলো হাতিল ফার্নিচারের আসবাবপত্র প্রদান করে পরিবর্তন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলাম বলেন, ঠিকাদারের জামানতের টাকা দিয়ে কিছু ফার্নিচার সরবরাহের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর টেলিফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।