চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, পদোন্নতি ও পদায়ন বাণিজ্য, বনভূমি দখলে সহযোগিতা এবং অর্থের বিনিময়ে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) প্রদানের মতো নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, বনকর্মী ও একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপি শাসনামলে ২০০৩ সালে সহকারি বন সংরক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগদানকারী ওই কর্মকর্তা সবচেয়ে বেশি প্রভাব খাটিয়েছেন আওয়ামী শাসনামলে। অভিযোগ রয়েছে, ভোলপাল্টানো ওই কর্মকর্তা অদৃশ্য শক্তি বলে সবসময় থেকেছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টাদের আশীর্বাদপুষ্ট। এই কারণে ২৩ বছরের চাকরিজীবনে একবারের জন্যও তাকে যেতে হয়নি রাজধানীর বাহিরে।
সময়ের কণ্ঠস্বরের অনুসন্ধান, বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাঠপর্যায়ের বনকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বিএনপি সরকারের আমলে বন ক্যাডারে যোগ দিলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়। বন বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, চেকপোস্টকেন্দ্রিক অর্থ লেনদেন, লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে তার প্রভাব ছিল। তার ক্ষমতার ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না জানালেও আড়ালে-আবডালে তাকে 'রাক্ষস' বলে সম্বোধন করেন তার সহকর্মীসহ বনের সাথে জড়িত লোকজন।
জানা যায়, বিসিএস ২২তম ব্যাচের মাধ্যমে ২০০৩ সালে বন ক্যাডারে যোগ দেন হোসাইন নিশাত। সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ২০১৩ সালের জুলাইয়ে ঢাকার সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার প্রভাব বিস্তার শুরু হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, 'বদলি, পদায়ন, এনওসি, লাইসেন্স ও নিয়োগ, সব ক্ষেত্রই একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন হোসাইন নিশাত। তার অপরাধ এতটাই বিস্তৃত যে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে।'
সোনারগাঁও চেকপোস্ট যেন হোসাইন নিশাতের চাঁদাবাজির স্থান:
ডিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় হোসাইন নিশাতের সবচেয়ে আলোচিত 'আয়ের কেন্দ্র' ছিল সোনারগাঁও চেকপোস্ট। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার গাছবোঝাই ট্রাক এ চেকপোস্ট অতিক্রম করত। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ট্রাক থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো এবং এ অর্থের বড় অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন করা হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ তার নিয়ন্ত্রণে যেত।
বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, চেকপোস্টটি কেবল বনজ পণ্য নিয়ন্ত্রণের স্থান ছিল না, বরং এটিকে কেন্দ্র করে একটি বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চেকপোস্টের স্টেশন অফিসার পদটিও হয়ে উঠেছিল রীতিমতো নিলামের বস্তু। মাত্র এক বছরের জন্য সেই পদে থাকতে হলে দিতে হতো ৫০ লাখ টাকা। সহকারী স্টেশন অফিসার ছিলেন ছয়জন- প্রত্যেককে পোস্টিং পেতে দিতে হতো ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে। বিনিময়ে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্ক কেন্দ্রীয়ভাবে পৌঁছানোর কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফরেস্ট গার্ড পদেও একই চিত্র। পোস্টিংয়ের জন্য সর্বনিম্ন ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। এর বাইরে কাঠের ডিপো, করাতকল, ইটভাটা এবং লাইসেন্স প্রদানের নামেও ঢাকার সামাজিক বন অঞ্চলে চলত নিয়মিত চাঁদাবাজি
নিয়োগ ও বদলির নিয়ন্ত্রণে নিশাত:
২০১৬ সালের নভেম্বরে হোসাইন নিশাত সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক (সংস্থাপন) হিসেবে দায়িত্ব পান। এ পদে থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, 'সংস্থাপন শাখা হলো বন বিভাগের সবচেয়ে প্রভাবশালী জায়গা। কে কোথায় যাবে, কে পদোন্নতি পাবে, কে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবে, সবকিছুই এই শাখা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল। যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন হোসাইন নিশাত।'
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ সময়ে রেঞ্জ অফিসারদের বদলিতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা, ফরেস্টারদের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ লাখ এবং বন প্রহরীদের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ বা চেকপোস্টে পোস্টিংয়ের জন্য বছরে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। শতাধিক রেঞ্জ থেকে এভাবে বছরের পর বছর তোলা হয়েছে শত শত কোটি টাকা।
এনওসি সার্টিফিকেট বাণিজ্য:
বন্যপ্রাণী আমদানি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) ইস্যুতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিটি এনওসির জন্য প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। প্রতি মাসে ১০০ থেকে ১৫০টি এনওসি ইস্যুর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ত্রগুলো জানায়, এসব এনওসি একবার ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বারবার নতুন সার্টিফিকেট নিতে হতো, যা একটি নিয়মিত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তারেক আজিজ নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অনেক সময় এনওসি পেতে অযথা বিলম্ব করা হতো। দ্রুত অনুমোদন প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার চাপ তৈরি করা হতো। বিষয়টি ব্যবসায়ীদের জন্য এক ধরনের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল।
বন বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, 'এনওসি ইস্যু একটি লাভজনক খাতে পরিণত হয়েছিল। প্রতিমাসে বিপুল সংখ্যক এনওসি দেওয়া হতো এবং প্রতিটি অনুমোদনের সঙ্গে লাখ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হতো। বন বিভাগের ভেতরে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস করতেন না।'
নীতিমালা পরিবর্তন করে ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়োগ:
বন বিভাগের একাধিক সূত্র বলছে, ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে বন বিভাগের নিয়োগ বিধিমালায় বিতর্কিত পরিবর্তন আনার পর ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার (রেঞ্জার) পদে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এই পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত বাচ্চু মিয়া, আব্দুল মালেকসহ প্রায় ১২০ জনকে ওই প্রক্রিয়ায় ফরেস্ট রেঞ্জার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা দাবি, দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদোন্নতি কাঠামো উপেক্ষা করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ায় বিভাগের ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। তাদের মতে, শতভাগ পদোন্নতিযোগ্য একটি পদে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ তৈরি করে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপকে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও ওঠে, যা নিয়ে বন বিভাগের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, 'সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব পাওয়ার পর বদলি ও পদায়ন কার্যত একটি নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যে পরিণত হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ, চেকপোস্ট কিংবা আয়বর্ধক পদে যেতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে আর্থিক সক্ষমতাই পোস্টিং পাওয়ার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল।'
আউটসোর্সিংয়েও অভিযোগ:
বন বিভাগে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নাইট গার্ড, ড্রাইভার, নৌকাচালকসহ বিভিন্ন পদে প্রায় ৪ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় 'বলাকা এন্টারপ্রাইজ'-এর মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক গিয়াস তালুকদার তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী হাসান মাহমুদের চাচাতো ভাই বলে জানা গেছে। এই নিয়োগে জনপ্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালে ২৮৪ জন ফরেস্ট গার্ড নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, একটি চার সদস্যের কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে, যেখানে নিশাত ছিলেন অন্যতম সদস্য।
৮,৫০০ হেক্টর বনভূমি গ্রাস:
ঢাকা কেন্দ্রীয় বন অঞ্চলের দায়িত্বে থাকাকালে- যার আওতায় ছিল গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট বন বিভাগ। হোসাইন নিশাতের সময়কালে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর বনভূমি বিভিন্ন সময়ে দখল হয়ে যায় বলে অভিযোগ আছে। সীমানা নির্ধারণ (ডিমার্কেশন) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে এসব দখলকে বৈধতার রূপ দেওয়া হয়েছে। এই জমিতে গড়ে উঠেছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা। বিপরীতে নতুন বনায়ন হয়েছে মাত্র ১,১৫০ হেক্টর।
চট্টগ্রামেও একই চিত্র। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী হাসান মাহমুদের ভাই এরশাদ হাসান রাঙ্গুনিয়ায় প্রায় ১,০০০ হেক্টর বনভূমি দখল করে ফলের বাগান, মাছের ঘের, গয়ালের খামার ও বাংলো বানিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সহযোগী ছিলেন হোসাইন নিশাত নিজেই।
অন্যদিকে অভিযোগ আছে, হোসাইন নিশাতের নামে বা ঘনিষ্ঠদের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সম্পদ রয়েছে। এছাড়া কানাডায় বাড়ি এবং আমেরিকায় সম্পত্তি কিনেছেন ডিএফও বেলায়েত হোসেনের মাধ্যমে, যিনি নিশাতের সহযোগী ও একই এলাকার মানুষ বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ টিকে থাকার পেছনে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ডক্টর হাসান মাহমুদ ও বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার ছিলেন তার প্রধান 'আশ্রয়দাতা'। নিশাত হাবিবুন নাহারকে 'মা' এবং সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সাহাব উদ্দিনকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন বলে জানা যায়। তাদের দাবি, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণেই অনেক অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি।
বনের ভেতরে জমি দখল, গাছ পাচার কিংবা অনুমোদন-বাণিজ্য- এসব ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সুত্রগুলোর ভাষ্য, বনে যেখানে অনিয়ম, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে তার নাম উঠে আসে।