স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ২৫ হাজার মিডওয়াইফ (ধাত্রী) নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এ তথ্য জানিয়েছেন।
রোববার (২১ জুন) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। পর্তুগালের লিসবনে অনুষ্ঠিত ৩৪তম ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অব মিডওয়াইভস (আইসিএম) ট্রায়েনিয়াল কংগ্রেসে অংশগ্রহণসহ সাম্প্রতিক ইউরোপ সফর নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, এ মাসের ১২ তারিখে পর্তুগালের লিসবন গিয়েছিলাম, সেখানে ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অব মিডওয়াইভসের ৩৪তম ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস হলো। সেখানে ১২২ দেশ থেকে তিন হাজারেরও বেশি মিডওয়াইফ এবং ইউএনএফপিএ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনেক দেশের সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীরাও এসেছিলেন। তিন দিনের একটা কনফারেন্স ছিল। সেখানে আমাদেরকে, আমাকে ইনভাইট করা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে এই কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা হিসেবে।
তিনি বলেন, আমরা সেখানে ঘোষণা দিয়েছি যে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার, আমরা বেশিরভাগ জোর দিচ্ছি আমাদের দেশের প্রাইমারি হেলথকেয়ারকে শক্তিশালী করার জন্য। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা যেটা প্রথাগতভাবে ট্রিটমেন্ট সেন্ট্রিক (চিকিৎসা নির্ভর), এইটাকে কীভাবে প্রিভেনশন সেন্ট্রিক (রোগ প্রতিরোধ নির্ভর) করা যায়- এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এই নিয়ে আমি কথা বলেছি।
আমরা বলেছি যে বাংলাদেশ আগামী তিন থেকে চার বছর সময়ের মধ্যে প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে। যাতে করে আমরা স্বাস্থ্যসেবাকে প্রত্যেকটা মানুষের, বিশেষ করে প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যসেবাকে প্রত্যেকটা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারি। এছাড়াও আমরা ২৫ হাজার মিডওয়াইফ আমরা নিয়োগ দেবো আগামী তিন থেকে চার বছরে পর্যায়ক্রমে।’
জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হলো আমাদের কোনো মা তার যখন স্বাভাবিক ডেলিভারি হবে তখন তাকে যেন একটা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া যায়। যাকে আমরা প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিট বলছি, প্রত্যেকটা ইউনিয়নে একটি করে প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিট হবে। শহরের প্রত্যেকটা ওয়ার্ডেও একটি করে প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিট হবে। এই প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিটে স্বাভাবিক যে ডেলিভারিগুলো সেগুলো এখানেই হবে। প্রতিটি প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিটে অন্তত দুজন করে মিডওয়াইফ কর্তব্যরত থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বলেন, সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ বেড আছে, সেখান থেকে আমরা ১০০ বেডে নিয়ে যাবো। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সকে আমরা মা এবং নবজাতকের যে সেবা, এই সেবাটা কমপ্রিহেনসিভভাবে দেবো। তার অর্থ হলো আমরা চাই না কোনো মা যার কমপ্লিকেটেড ডেলিভারি, তাকে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের বাইরে যাতে যেতে না হয়। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের ভিতরেই যেন মা তার শিশু জন্ম দিতে পারেন এবং শিশুর যদি কোনো সমস্যা থাকে নবজাতকের, সেই নবজাতকের সেবা যেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই হয়। এ কারণেই আমরা বলেছি যে আমরা আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ২৫ হাজার নতুন মিডওয়াইফ নেবো।
বর্তমানে দেশে মিডওয়াইফের সংখ্যা ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার জনের মতো বলেও জানান তিনি।
জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও বলেন, দেশে ৫ হাজার ৮০০-র মতো ইউনিয়ন আছে, প্রত্যেক ইউনিয়নে যদি আমরা দুজন করে নেই হ্যাঁ, তাহলে পরে এখানে ১১ হাজারেরও বেশি মিডওয়াইফ লাগবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে ৫০০, সেখানে যদি আমাদের মিডওয়াইফ দিয়ে সঠিকভাবে ইকুইপ করতে হয়, সেখানেও প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত তিন থেকে চারজন মিডওয়াইফ নিতে হবে। এছাড়াও জেলা হাসপাতালেও আমাদের মিডওয়াইফ লাগবে।
‘প্রাইভেট যে হাসপাতালগুলো আছে, এটা আপনারা শুনলে পরে একটু অবাক হবেন যে কোনো প্রাইভেট হাসপাতালেই এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক ডেলিভারির জন্য যে ডেডিকেটেড ইউনিট এবং সেখানে মিডওয়াইফ, এইটা কিন্তু আমাদের এখনো ওইভাবে হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আরও বলেন, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী যেটা আমরা বলেছি, এই স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেবে। এই মুহূর্তে আমাদের দেশে তিন রকমের স্বাস্থ্যকর্মী আছে। একটা হলো আপনার ডিজি হেলথ, তাদের অধীনে আছে, এদেরকে আমরা বলি হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট। আরেকটা ক্যাডার আছে ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের অধীনে, এটাকে আমরা বলি ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট। আরেকটা আছে কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের অধীনে, এটাকে আমরা বলি সিএইচসিপি। আমরা এই তিন ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীকে একটা ক্যাডারে পরিণত করবো। তাদেরকে আমরা নাম দেবো কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার বা অন্য একটা বাংলা ভালো একটা নাম আমরা দিতে পারি।
তিনি বলেন, এরা প্রতিটি ঘরে দুই মাসে অন্তত একবার করে যাবে। একটা প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ার প্যাকেজ ডেলিভারি করবে এবং বর্তমানে আমাদের দেশে এইচএ, এফডব্লিউএ এবং সিএইচসিপি মিলিয়ে ৪১ থেকে ৪২ হাজার আছে। আমরা আরও এক লাখ নেবো। তাতে এক লাখ ৪২ হাজার বা প্রায় দেড় লাখ যদি আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী থাকে, তাহলে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে আমরা নিশ্চিত করতে পারবো যে তারা দুই মাসে অন্তত একবার করে একজন স্বাস্থ্যকর্মী সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারবে।
জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, মিডওয়াইফ হলো এর ওপরে। মিডওয়াইফরা থাকবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, আমরা যেটা প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিট বলছি। এছাড়া রিপ্রোডাক্টিভ হেলথের যে সেবাগুলো, এই সেবাগুলো দেওয়ার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকবে দুজন করে মিডওয়াইফ, উপজেলা পর্যায়ে থাকবে অন্তত চারজন মিডওয়াইফ। জেলা হাসপাতালেও মিডওয়াইফ থাকবে এবং প্রাইভেট হাসপাতালেও যেখানে ডেলিভারির কাজ হবে সেখানেও মিডওয়াইফ থাকবে।