ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় এক সাবেক বাসচালকের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া টাকার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে গণনার সময় পাঁচটি টাকা গণনার মেশিন বিকল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বাড়িটি থেকে মোট ২৮ কোটি রুপি নগদ এবং ১৫ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২১ কোটি রুপি।
গ্রেফতার হওয়া মিনার মণ্ডল একসময় বাসচালক ছিলেন। তিনি স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ী তুলু মণ্ডলের আত্মীয়। তুলু মণ্ডলকে সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত করা হয়। চলতি মাসের শুরুতে অনুব্রত মণ্ডল দলীয় বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেন।
পুলিশ মিনার মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন, উদ্ধার হওয়া নগদ অর্থ ও স্বর্ণ তুলু মণ্ডল এবং তার কথিত অবৈধ সিন্ডিকেটের।
বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া অভিযানে প্রথমে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ রুপি গণনা করা হয়। পরে পুরো অভিযান শেষে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ বেড়ে ২৮ কোটিতে পৌঁছায়। তদন্তকারীরা জানান, মিনার মণ্ডলেরও পাথর ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং তুলু মণ্ডলের মালিকানাধীন পাথরের খনি ও ক্রাশিং ইউনিটের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।
এত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে তা সংগ্রহ করা হয়েছে, সে বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ। অভিযানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বড় একটি দল অংশ নেয়। তবে কী কারণে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল বা এটি কোনো অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, বালু মাফিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রশংসনীয় কাজ করেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ উদ্ধার হয়েছে। তিনি জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে এবং জনসম্পদ লুটকারীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিনার মণ্ডল একসময় রাজ্য পরিবহন বিভাগের কর্মী ও বাসচালক ছিলেন। পরে তিনি পাথর ব্যবসায় যুক্ত হন। তার আয়ের উৎস এবং বিপুল সম্পদের উৎস এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তৃণমূলে পালটাপালটি অভিযোগ
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে পালটাপালটি অভিযোগ। অভিযুক্তদের সঙ্গে অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সামনে এনে একে অপরকে দোষারোপ করছেন দলটির নেতারা।
তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, কিছু নেতা নিজেদের ‘ভালো তৃণমূল’ হিসেবে তুলে ধরে অবৈধ সম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন—এমন প্রশ্ন উঠছে। যাদের বাড়ি থেকে টাকা উদ্ধার হয়েছে, তারা এসব নেতার ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নেতাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত।
অন্যদিকে তৃণমূলের সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বীরভূম দীর্ঘদিন ধরে এক সাবেক তৃণমূল মন্ত্রী ও ‘বীরভূমের বাঘ’ হিসেবে পরিচিত নেতার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর, তা তদন্ত করে বের করা উচিত।
ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল বিধায়ক প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এত বড় অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের জন্য পুলিশ প্রশংসার দাবিদার। তবে এই অর্থ কার এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, সেটিও তদন্ত করে বের করতে হবে।
আলোচনায় ১০০ কোটি রুপির জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে
এই অভিযানের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তুলু মণ্ডলের মেয়ের ২০২৪ সালের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে। বীরভূমের সিউড়িতে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বাংলা ও বলিউডের বেশ কয়েকজন তারকা উপস্থিত ছিলেন। সূত্রগুলোর দাবি, বিয়ের পেছনে প্রায় ১০০ কোটি রুপি ব্যয় করা হয়েছিল। অতিথিদের মধ্যে অভিনেতা অঙ্কুশ হাজরা, দর্শনা বণিক, আরবাজ খান ও জারিন খানও ছিলেন।