ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ওয়াসিক বিল্লাহর বিরুদ্ধে চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশ, বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে ঘুষ দাবি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে। রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসিন্দা মোবারক হোসেন খান নামের এক ব্যক্তি জনস্বার্থে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর এই আবেদনপত্রটি দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, এআরও ওয়াসিক বিল্লাহ কাস্টমস হাউসকে অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেছেন। সহকর্মী অন্য এক কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ‘মিথ্যা ঘোষণা’র মাধ্যমে বড় ধরনের চোরাচালানে ইন্ধন দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত করছেন বলে দাবি করা হয়।
অভিযোগপত্রে ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ওয়াসিক বিল্লাহর বিরুদ্ধে যে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে:
দুর্নীতি ও চোরাচালানের সিন্ডিকেট: সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসিক বিল্লাহ ঢাকা কাস্টমস হাউসকে দুর্নীতি ও চোরাচালানের আখড়ায় পরিণত করেছেন। তার এই অপকর্মের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাস্টমস হাউসের আরেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন নিয়োজিত রয়েছেন। এই দুই কর্মকর্তা পারস্পরিক যোগসাজশে ‘মিথ্যা ঘোষণা’র আড়ালে বড় ধরনের চোরাচালান বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন, যার মূলহোতা ওয়াসিক বিল্লাহ নিজেই। এর ফলে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
নিয়মতান্ত্রিক ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও ঘুষ দাবি: বর্তমানে ঢাকা কাস্টমস হাউসে নিয়ম মেনে বৈধভাবে কর পরিশোধ করে পণ্য খালাস করা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াসিক বিল্লাহ প্রায়শই পণ্য খালাসের বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। কোনো ব্যবসায়ী বৈধভাবে সকল শর্ত পূরণ করে পণ্য আমদানি করলেও, এই কর্মকর্তার চাহিদামতো ঘুষ না দিলে তাদের ফাইল আটকে দেওয়া হয় এবং নানাভাবে হয়রানি করা হয়।
৬ মাসে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ: ওয়াসিক বিল্লাহর দৈনিক দুর্নীতি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কার্যকলাপে সাধারণ ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। কাস্টমস হাউসে ফাইল ছাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে প্রতিষ্ঠানভেদে ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করেন তিনি। কাস্টমস অফিসে থাকাকালীন ঘুষ ছাড়া তিনি কোনো ফাইলেই হাত দেন না। তার এই একগুঁয়েমি ও দম্ভের কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাধারণ সেবাগ্রহীতারা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। গত মাত্র ৬ মাসে তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অবৈধ উপায়ে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।
জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ: চাকরি জীবনের সকল কর্মস্থলে ওয়াসিক বিল্লাহ অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে প্লট,ফ্লাটসহ প্রচুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হয়েছেন। বিশেষকরে ঢাকার মিরপুরে বাউনিয়া মৌজায় ৩৬৪৯৭ নম্বর খতিয়ানে ৩৩ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। উত্তরার ”কিং ফিশার বার” এর শেয়ার হোল্ডার ওয়াসিক বিল্লাহ। গ্রামের বাড়ি নওগায় করেছেন প্রচুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। যা তার জ্ঞাত আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ওয়াসিক বিল্লাহ এবং তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয় পত্রের বিপরীতে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংক ব্যালেন্স অনুসন্ধান করলে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
আওয়ামী সাংগঠনিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর ওয়াসিক বিল্লাহ ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী প্রভাব বলয়ে ২০১৮ সালে এনবিআরে যোগদান করেন। নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে নিজের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে নির্বিঘ্নে দুর্নীতি করেছেন। বাগিয়ে নিয়েছেন প্রাইজ পোস্টিং। বাংলাদেশ কাস্টমস এন্ড ভ্যাট অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের(বাকাএভ) কার্যকরী মহাসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন ওয়াসিক বিল্লাহ। ওয়াসিক বিল্লাহ এই সংগঠনের পদের প্রভাব খাটিয়ে সব সময় ভালো জায়গায় পোস্টিং নেয়া এবং পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য করে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
এছাড়া, নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ওয়াসিক বিল্লাহ বৈষম্য বিরোধি ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধেও নানা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহন করেছেন। পরোক্ষভাবে অর্থায়নও করেছেন। এছাড়া, অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের সময়ে এনবিআরের বিভক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা রাষ্ট্রবিরোধি আন্দোলনেও ওয়াসিক বিল্লাহ সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশ কাস্টমস এন্ড ভ্যাট অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশনের(বাকাএভ) কার্যকরী মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা ওয়াসিক বিল্লাহ নিরীহ এআরও এবং আরও পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্দোলনে অংশগ্রহনস করতে ইন্ধন প্রদান করতেন। আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্যে ওয়াসিক বিল্লাহ অর্থায়নও করেছেন বলে অভিযোগ পত্রে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারী জনস্বার্থে ও দেশের রাজস্ব সুরক্ষার লক্ষ্যে ওয়াসিক বিল্লাহ’র অবৈধ সম্পদের হিসাব অনুসন্ধানে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ওয়াসিক বিল্লাহ’র বক্তব্য জানতে তার হোয়াটএ্যাপে বার্তা প্রদান করা হলেও তিনি কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নি।