প্রচলিত আইন ভেঙে ঢাকায় একটি প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. হামিদুর রহমান খান। বিধিমালা অনুযায়ী রাজধানীতে সরকারি একটি ফ্ল্যাট বা প্লট বরাদ্দ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় বিসিএস প্রশাসন ১৩ ব্যাচের এই কর্মকর্তা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পে একটি প্লট নেওয়ার পর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) থেকে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেন। এই বিশেষ সুবিধা নিয়ে একটিতে পার পেয়ে গেলেও আরেকটিতে ঠেকে যান তিনি। এক পর্যায়ে কায়দা করে ফ্ল্যাটের পুরো কিস্তির টাকা পরিশোধের আগেই আম-মোক্তার দলিলের মাধ্যমে আরেক জনের কাছে বিক্রি করেন। এদিকে এই ফ্ল্যাটের বিপরীতে ব্যাংক ঋণ নিয়ে রেখেছেন আগেই। বিধি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করার আগে বা ব্যাংক থেকে অনাপত্তি পত্র গ্রহণ না করে অন্যত্র হস্তান্তরের সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি ডা. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বেশির ভাগ কর্মকর্তার টার্গেট থাকে কিভাবে সরকারি ফ্ল্যাট-প্লট বরাদ্দ নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিয়মের বাইরে সুবিধা নিয়ে থাকেন। তবে এদের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে তদন্ত করা হয় না। সরকারের উচিত এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া।’
জাগৃক সূত্র জানায়, মিরপুরের ১৫ নম্বর সেকশনে জয়নগর ৫২০ ফ্ল্যাট প্রকল্পের ৫ নম্বর বিল্ডিং-এর বি/৪ নম্বরের প্রায় ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট এবং একটি গ্যারেজের বরাদ্দ নেন মো. হামিদুর রহমান খান। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে তিনি প্রথম কিস্তি দেওয়ার পর এই ফ্ল্যাটের বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণও গ্রহণ করেন। পরে ফ্ল্যাটটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্মসচিব মু. নূরুজ্জামান শরীফের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যে তাকে আম-মোক্তার নিয়োগের অনাপত্তির জন্য জাগৃকে আবেদন করেন। অথচ জাগৃকের ফ্ল্যাট বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটের কিস্তি সম্পূর্ণ পরিশোধ ও চূড়ান্ত দলিল সম্পাদনের আগে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সুযোগ নেই। সেই সময়ে জাগৃকের উপ-পরিচালকের (ভূমি ও ব্যবস্থাপনা উইং) দায়িত্বে ছিলেন আর এম সেলিম শাহনেওয়াজ। তিনি নথিপত্র যাচাই করে দেখেন ফ্ল্যাটের কিস্তির টাকা সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়নি। আবার ব্যাংক থেকেও কোনো অনাপত্তি পত্র নেওয়া হয়নি। তাই তিনি ফ্ল্যাটটি আম-মোক্তার নিয়োগের অনাপত্তি আটকে দেন। তবে ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে হামিদুর রহমান জাগৃক থেকে ২০২৪ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অনাপত্তি নেন।
রাজউক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির নবম বোর্ড সভায় মো. হামিদুর রহমান খান সরকারি একটি প্লটের সাময়িক বরাদ্দপত্র পান। কথা ছিল রাজউকের উত্তরা তৃতীয় প্রকল্প থেকে তিনি একটি প্লট বরাদ্দ পাবেন। কিন্তু প্লটের চূড়ান্ত বরাদ্দ জারি হওয়ার আগেই সরকারের পরিবর্তন হয়। পরে সরকারের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হলে বিশেষ কোটায় বরাদ্দ পাওয়া প্লটের আইডি নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন আটকে যায়।
জাগৃক সূত্রে জানা গেছে, এরইমধ্যে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করে মু. নূরুজ্জামান শরীফও ফ্ল্যাটটি অন্যত্র হস্তান্তর করতে চান। সেই লক্ষ্যে ফ্ল্যাটের অবশিষ্ট সব কিস্তির টাকা এককালীন পরিশোধের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. হামিদুর রহমান খান বলেন, ‘আমি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই ফ্ল্যাট হস্তান্তর করেছি। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। আর প্লট প্রাপ্তির বিষয়টি প্রসপেক্টাসে বর্ণিত শর্ত দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। এ বিষয়ে রাজউকের কোনো সেট রুল নেই।’
একই বিষয়ে জানতে সাবেক যুগ্মসচিব মু. নূরুজ্জামান শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে তিনি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।