গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মাহবুবুল হক চৌধুরীকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগের মধ্যেই তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, বড় অঙ্কের বিল অনুমোদনে অনিয়ম এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের মধ্যেই পদোন্নতির জন্য নাম প্রস্তাব করায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে গত ১ জুলাই জারি করা একটি প্রস্তাবপত্রে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) পদে কর্মরত একজন কর্মকর্তা আগামী ১ সেপ্টেম্বর অবসরে যাবেন। ওই পদটি শূন্য হলে সেখানে মাহবুবুল হক চৌধুরীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে মাহবুবুল হক চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল-৩, ঢাকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকাতেও তাকে ওই পদে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদের সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান ঃ
১৭ কোটি টাকার বিল অনুমোদনে অনিয়ম, টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার ও প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ; জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম নিয়েও দুদকের অনুসন্ধানে নাম
মাহবুবুল হক চৌধুরীকে ঘিরে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটিকে কেন্দ্র করে। ২০২৬ সালের প্রথম অধিবেশনে প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম ও হেডফোন ব্যবস্থায় ত্রুটির খবর প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের মধ্যে মাহবুবুল হক চৌধুরীর নামও এসেছে।
পরবর্তীতে এ ঘটনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলীকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মাহবুবুল হক চৌধুরীসহ আট প্রকৌশলীকে তলব করা হয়েছিল এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিদেশ সফরের তথ্য, স্ত্রী-সন্তানের পরিচয় ও সম্পদসংক্রান্ত নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়।
দুদকের অনুসন্ধান টিম জাতীয় সংসদ ভবনের কয়েক বছরের টেন্ডার, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি তলব করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটি নিয়ে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পাঁচ প্রকৌশলীর মধ্যে মাহবুবুল হক চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
১৭ কোটি টাকার বিল অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
মাহবুবুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে গণপূর্তের ই/এম সার্কেল-৩-এর একটি প্রকল্পে প্রায় ১৭ কোটি টাকার বিল অনুমোদন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী ঠিকাদার আলাউদ্দিন ওয়াজেদ দুদকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অনুমোদিত বিলের বিপরীতে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বাজারদরের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। নিয়মিত যাচাই-বাছাই ছাড়াই কিছু বিল দ্রুত অনুমোদন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী ঠিকাদারের দাবি, এই বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী একটি বলয়ের ভূমিকা ছিল। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কার্যাদেশ, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, সরবরাহ নথি ও বাস্তব কাজের অগ্রগতি যাচাই করা প্রয়োজন।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ই/এম সার্কেল-৩-এর টেন্ডার ও ক্রয় কার্যক্রমে মাহবুবুল হক চৌধুরীর দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ঠিকাদারের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য পূর্ণাঙ্গ নথি প্রতিবেদকের হাতে না থাকায় এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। টেন্ডার নথি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের তালিকা পর্যালোচনা করলেই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
আরও কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ
মাহবুবুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) একটি ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রকল্পে প্রায় ১৭ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৪৪ টাকার অনিয়মের অভিযোগের কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ফার্নিচার ক্রয় এবং জাতীয় সংসদ ভবনের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও সাউন্ড সিস্টেমের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্তভাবে বিবেচ্য হবে।
সম্পদ নিয়েও অভিযোগ
মাহবুবুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার ইকবাল রোডে একাধিক ফ্ল্যাট, আগারগাঁওয়ে চারতলা ভবন, উত্তরা ও বসুন্ধরায় প্লট, আফতাবনগরে জমি এবং বনশ্রী-আমুলিয়া এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি থাকার দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও মূল্য সম্পর্কে প্রতিবেদকের হাতে থাকা তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ভূমি রেকর্ড, দলিল, নামজারি, আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অভিযোগের মধ্যে কেন পদোন্নতির প্রস্তাব?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এবং জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম সংক্রান্ত ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরও তাকে কেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করা হলো?
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে দোষী বলা যায় না। তবে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান বা তদন্ত চললে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
বক্তব্য মেলেনি
এসব অভিযোগের বিষয়ে মাহবুবুল হক চৌধুরীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
এদিকে জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মাহবুবুল হক চৌধুরীকে বর্তমান সাউন্ড সিস্টেমের প্রয়োজনীয় সংস্কার, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। তিনি জানিয়েছিলেন, সংস্কারের পর প্রথম অধিবেশনের শেষ ১৫ থেকে ২০ দিনে কোনো সমস্যা দেখা যায়নি এবং বাজেট অধিবেশনও নির্বিঘ্নে চলছিল।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই—অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই মাহবুবুল হক চৌধুরীকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?