ফ্যাসিবাদের দোসর অভিযোগের পর অভিযোগ, তবু থামেনি পদোন্নতির তদবির—গণপূর্তের কায়সার কবিরের

আপলোড সময় : ২৪-০৮-২০২৬ ০৬:১৭:১৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৮-২০২৬ ০৬:১৭:১৬ অপরাহ্ন



জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি—এমন অভিযোগের মধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির।

তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তন, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশনভিত্তিক আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার ও পোস্টিং সিন্ডিকেট পরিচালনা, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে অর্থ লেনদেনের মতো অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা অনুযায়ী যেসব কাজে লিমিটেড টেন্ডার মেথড (এলটিএম) অনুসরণের কথা ছিল, সেসব কাজের ক্ষেত্রে ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) ব্যবহার করে দরপত্র আহ্বান করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওটিএম পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক হলেও সংশ্লিষ্ট দরপত্রগুলো এমনভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট কিছু পছন্দের ঠিকাদার সুবিধা পান এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারে।

অন্তত ৬০টির বেশি দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব দরপত্রের মধ্যে রয়েছে ১০৬০৬৮৯, ১০৭০৫৪৬, ১০৬৬৫৯৪, ১০৬৭৭২৪, ১০৬৬৬০২, ১০৬৭৭২১, ১০৭০৫৪৩, ১০৭০৫৪৫, ১০৬৭৭২৭, ১০৬৭৭২৬, ১০৬৭৭২৫, ১০৬৭৭২৩, ১০৭০৫৪০, ১০৭০৫৪৮, ১০৬৬৫৮৯, ১০৫৮০৭৮, ১০৪৫৫৪৩, ১০৪৫৫৫০, ১০৫৮৪৯৯, ১০৫৮৫০০, ১০৫৮০৮১, ১০৫৮০৮৪, ১০৬০০৮৪, ১০৪৫৫১৫, ১০৪৫৫১৮, ১০৪৫৫২১, ১০৪৫৫২২, ১০৪৫৫২৩, ১০৪৫৫২৫, ১০৪৫৫২৬, ১০৪৫৫২৭, ১০৪৫৫৩১, ১০৪৫৫৪১, ১০৪৫৫৪৬, ১০৬০০৭৭, ১০৫৮১২৪, ১০৪৩৩৫২, ১০৪৩৩৬১, ১০৪৩৩৬৭, ১০৪৩৩৭৩, ১০৪৩৪১০, ১০৪৩৪১৪, ১০৪৩৫১৫, ১০৪৩৪১৭, ১০৪৩৪১৮, ১০৪৩৪১৯, ১০৪৩৪২০, ১০৪৩৪২১, ১০৪৩৪২২, ১০৪৩৪২৪, ১০৪৩৪২৬, ১০৪৩৪২৭, ১০৪৩৪২৯, ১০৪৩৪৩০, ১০৪৩৫৩১, ১০৪৩৪৩২, ১০৪৩৪৩৩, ১০৪৩৪৩৪, ১০৪৩৪৩৫, ১০৪৩৪৩৮, ১০৪৩৪৪০, ১০৪৩৪৪১ ও ১০৪৩৪৪৩।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনিয়মের অভিযোগ শুধু টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এসব কাজের ক্ষেত্রে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে। কাজের ধরন ও আর্থিক মূল্য অনুযায়ী কমিশনের পরিমাণ কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এসব টেন্ডারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ রাজধানীর সরকারি ভবন ও সরকারি বাসভবনের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রতি বছর এ বিভাগে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের কাজ বরাদ্দ হয়। ফলে টেন্ডার আহ্বান, কাজের অনুমোদন, ঠিকাদার নির্বাচন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় নির্বাহী প্রকৌশলীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কায়সার কবির এই প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিভাগের টেন্ডার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তিনি সরাসরি সব কার্যক্রম পরিচালনা না করে তাঁর আস্থাভাজন কিছু অধস্তন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। বদলি, দায়িত্ব বণ্টন, কাজ অনুমোদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তাঁর প্রভাব ছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা বা তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ানো কর্মকর্তাদের বদলি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কিংবা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। পোস্টিং, বদলি ও বার্ষিক মূল্যায়নের মতো বিষয়েও তাঁর প্রভাব থাকার কারণে অনেক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলে দাবি করা হয়েছে।

কায়সার কবিরের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। সাভার সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরবর্তীতে আব্দুল কাদের চৌধুরী জিকে শামীম-সংশ্লিষ্ট ক্যাসিনো কাণ্ড ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচিত হন এবং পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে পদাবনতির মুখে পড়েছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সাভারে দায়িত্ব পালনের সময়ই কায়সার কবির সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের কৌশল আয়ত্ত করেন।

পরবর্তীতে জামালপুরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজম এবং তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর ই-জিপি (e-GP) সিস্টেমের পাসওয়ার্ড তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং এর মাধ্যমে তিনি দরপত্র প্রক্রিয়ায় এককভাবে প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগটি সত্য হলে তা সরকারি ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

ঢাকায় ফিরে কায়সার কবির আজিমপুর, গুলশানসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাব-ডিভিশনে দায়িত্ব পালন করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব পদায়ন নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পাবনা জেলার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে তিনি আজিমপুরে নিজের পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করেন। একই প্রক্রিয়ায় তাঁর ঘনিষ্ঠ ইলিয়াস আহমেদ ও মাহাবুব নামের আরও দুই প্রকৌশলী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল হন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে তাঁর পদায়ন নিয়েও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাজিন কন্সট্রাকশন লিমিটেডের কর্ণধারকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পদায়ন নেন। এরপর থেকেই বিভাগটিতে ব্যাপক টেন্ডার বাণিজ্য শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মুসার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। মুসার মাধ্যমে আন্তঃজেলা ভ্রমণ, নগদ অর্থ লেনদেন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থায়নের অভিযোগও করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, এমনকি শেখ কামালের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীতে বসবাস, গাড়ি ব্যবহার এবং পারিবারিক ব্যয়ের ধরন তাঁর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র তাঁর সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন বা হত্যাকাণ্ডে অর্থায়নের মতো গুরুতর অভিযোগও কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।

কায়সার কবিরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক ভয়ের পরিবেশের দাবি। কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, পোস্টিং, বদলি, দায়িত্ব বণ্টন ও বার্ষিক মূল্যায়নে তাঁর প্রভাব থাকার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না। তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ালে প্রশাসনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।

এ বিষয়ে কায়সার কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন। টেন্ডারের আইডিগুলো যাচাই না করে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না বলেও তিনি জানান।

সামগ্রিকভাবে কায়সার কবিরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পোস্টিং-বদলি নিয়ন্ত্রণ এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর পাশাপাশি ই-জিপি ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য, প্রশাসনিক চাপ এবং সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদকীয় :

উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য : ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সম্পাদক : তোফাজল আহমেদ ফারুকী
ব্যাবস্থাপনা সম্পাধক : আব্দুল্লাহ রানা সোহেল
প্রকাশক : মোঃ সোহেল রানা
বার্তা সম্পাদক : মোঃ আব্দুল কাদের জিলানী
প্রধান প্রতিবেদক : হাসিবুর রহমান হাসিব 

যোগাযোগের ঠিকানা :

লাবিনা এপার্টমেন্টে # বাড়ি এ-৩, রোড # ০৮, সেক্টর #০৩,উত্তরা
উত্তরা মডেল টাউন -ঢাকা -১২৩০, বাংলাদেশ

মোবাইল :  ০১৭১৭-৬৭৬৬৬৪

ই-মেইল :  dailyvoicenews247@gmail.com